শনিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৪

অসীম সাহসী বীর গারো মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্র সাংমা

অসীম সাহসী বীর গারো মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্র সাংমা

দেশ স্বাধীন করেও আজও আমরা পরাধীন!
ফিডেল ডি সাংমা।

নিজেদের দেশ ও মাটিকে ভালবেসে ১৯৭১ সালে অস্ত্র হাতে যাঁরা জীবনবাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাদের মধ্যে অনেক আদিবাসী মুক্তিযুদ্ধাও ছিলেন, এখবর আজ আর নতুন নয়। তাঁরা জাতি-ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে মুসলমান ও হিন্দু মুক্তিসেনাদের সাথে সমান তালে হাতে অস্ত্র নিয়ে শক্রর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরেছিল। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে শত্রুদের পরাজিত করে বাংলার বুকে লাল সবুজ পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিল। সে সময় জীবনবাজী রাখা টগবগে আদিবাসী বীর মুক্তিসেনারা আজ বয়সের ভারে ন্যুব্জ এবং অভাব অনটনে জর্জরিত। তাঁদের অনেকেই পরিবার পরিজন নিয়ে কোন রকমে মাথা গুঁজারও ঠাই পান না। এঁদের কেউ কেউ অন্যের জমিতে কাজ করেন। কেউবা আবার বর্গার জমি নিয়ে চাষ করেন, আবার কেউ কেউ অনাহারে অর্ধাহারে, বিনা অষুধে রোগে শোকে ধুকে ধুকে মৃত্যুর পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। ঘরে ফসল তুলতে  হয়। কাজ না করলে অন্নের সংস্থান হয় না। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে শত্রুকে পরাজিত করে বাংলার স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু পান নি স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ বলে জানালেন আমাদের আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধারা।

১৬ই ডিসেম্বর নিজগ্রামে (ধরাটি) ঢাকাথেকে আগত মানবিক সংগঠন এবং গ্রামের জনগন সম্মিলিতভাবে  সম্বর্ধনা দিলেন গ্রামের ৩ গারো মুক্তিযোদ্ধাকে। তাঁদের মধ্যে চীন দালবত, ফালগীন দালবত এবং এঁদের আরেকজন ধীরেন্দ্র সাংমা। গারো আদিবাসীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে যিনি সবচেয়ে সাহসী ও শক্তিশালী বলে খ্যাত ছিলেন, অথচ আজ তিনিই তাঁর শারীরিক সমস্যার কারনে সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেন নি। তাই “মানবিক” এবং গ্রামবাসীর পক্ষে উনার বাড়িতে আমরা "দামা" গ্রুপের সদস্যরা হাজির হয়েছিলাম। আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্র সাংমা আমাদের দেখে হতবাক হলেন। পরে আমাদেরকে রোদ পোহানোর সুবিধার কথা বলে তাঁর বাড়ির উঠোনে বসতে বললেন। আমরা তাঁকে সম্বর্ধনার ফুল, উত্তরীয়, বিজয়ের প্রতীক ফুল এবং অন্যান্য উপহার উনার হাতে তুলে দিতেই উনার অনেকদিনের জমানো ক্ষোভ, দুঃখের মলিন মুখ নিমিষেই স্বাধীনতার লাল সূর্য্যের মত রক্তিম হয়ে উঠল। আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে তিনি  জানালেন, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে উনাকে দেখার জন্য, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলাপ করার জন্য, তাঁর জীবন যাপনের খোঁজ নেওয়ার এপর্যন্ত কেউ যায় নি।

 অসীম সাহসী এ বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম- ধীরেন্দ্র সাংমা। পিতার নাম থনিন্দ্র মারাক, মাতা- গেন্দি দালবত। বর্তমান ঠিকানা, গ্রাম- ধরাটি, পোস্ট- পীরগাছা, উপজেলা- মধুপুর, জেলা- টাঙ্গাইল। মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্র সাংমা, জাতিতে গারো। জন্ম- ১৯৩৭খ্রিস্টাব্দ। তিনি ৮ম শ্রেণীতে পড়াশুনা করেছেন। পিতা- থনিন্দ্র মারাক, মাতা- গেন্দি দালবত। বর্তমান ঠিকানা, গ্রাম- ধরাটি, পোস্ট- পীরগাছা, উপজেলা- মধুপুর, জেলা- টাঙ্গাইল। ছেলেমেয়ের সংখ্যা ১০জন এবং এদের ঘরে মোট ২৪ জন নাতিপুতি রয়েছে। মস্তিস্কে বিকৃত ১ ছেলেকে নিয়ে ছোট ছেলে নবীন নকরেকের সংসারে দিনাতিপাত করছেন। বাকী সব ছেলেমেয়রা বিয়েসাদী করে যার যার মত কোনরকমে সংসার ধর্ম করছেন। গারো মুক্তিযোদ্ধার ধীরেন্দ্র সাংমার সাথে সাক্ষাতের সময় উনার কাছে আমরা কিছু প্রশ্ন রেখেছিলাম। সাক্ষাৎকার গ্রহণে আমাকে সহযোগিতা করছেন “দামা” গ্রুপের সদস্য যোনাথন নকরেক এবং করবী জেত্রা।

প্রশ্ন-১। মুক্তি যুদ্ধে আপনি কিভাবে গেলেন?
আমরাও এ দেশেরই সন্তান। মুক্তিযুদ্ধের আগে ৮ম শ্রেণীতে পড়ার সময়েই পশ্চিম পাকিস্তানের এদেশের প্রতি অন্যায় জুলুমের কথা জানতাম। তারপর বিভিন্ন মাধ্যমে যখন জানলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন, তখনই ভাবলাম এদেশকে রক্ষা করতে আমরাও যাবো মুক্তিযুদ্ধে। করতে। তারপর (দিন তারিখ মনে নেই) বাড়ির কাউকে না জানিয়ে রাতের অন্ধকারে ঘন বনজঙ্গল পেরিয়ে আমরা চলে যাই ভারতের রংনাবাগ ট্রেনিং সেন্টারে। সেখানে রাইফেল, বন্দুক, মেশিনগান, গ্রেনেড চালানো শেখানো হয়েছে।

প্রশ্ন-২। আপনারা কোথায় এবং কোন ফ্রন্টে যুদ্ধে ছিলেন?
আমরা ভারতের রংনাবাগ ট্রেনিং সেন্টারে ১৮ দিন ট্রেনিং শেষে দেশে এসে ১১ নং সেক্টরে যোগ দিই। এই দলে আমরা ২১জন আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা  ছিলাম। এদের মধ্যে আমাদের ধরাটি গ্রামের আমার সাথে চীন দালবত, অমলেশ মৃও ছিলেন। সেসময় জগন্নাথগঞ্জ ঘাট ও কামালপুরে কয়েকটি অপারেশনে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীও ছিলেন। তিনি শেরপুরের ঝিনাইগাতি এলাকায় যুদ্ধ করেছেন। তারপর ধনিয়া, কামালপুর, কাটাপুল, বর্গাডাব এলাকায় যুদ্ধ করে শত্রুর চলার পথ রুদ্ধ করে দিয়ে বিভিন্ন ব্রীজ ধ্বংস করেন। পুরাগাছায় পাকিস্তানী ক্যাম্প এবং নকশি ক্যাম্প এটাক করেন।

প্রশ্ন-৩। ৭১ এ যখন যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়েছিল তখন আপনারা সিদ্ধান্ত নিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন, তখন কি আপনি ভেবেছিলেন  বাঙ্গালীদের সঙ্গে পাকিস্তান থেকে বের হয়ে আসা প্রয়োজন?
হ্যা, তাতো অবশ্যই। কারণ আমরাওতো এ দেশেরই সন্তান। এ দেশেই আমাদের জন্ম-কর্ম। পশ্চিম পাকিস্তানের এদেশের প্রতি অন্যায় জুলুমের কথাতো আমরাও জানতাম। দেশকে মুক্ত করতে এইতো সুযোগ। তাই আমরাও সবার সাথে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরেছিলাম। অথচ এখন বাঙ্গালীরা আমাদের হেয় ভাবে, এটাই কষ্টদায়ক।

প্রশ্ন-৪। যুদ্ধের স্বপক্ষে কোন কোন বিষয়গুলি যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করেন?
বাংলাদেশ স্বাধীন না হলেতো আমরা সবাই পরাধীন থেকে যেতাম। পাকিস্তানীদের অন্যায় অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করে থাকতে হতো। ওদের দয়া দাক্ষিন্ন নিয়ে বেঁচে থাকতে হতো। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু আমরা আদিবাসীরা স্বীকৃতি পেলাম না; আর আমরা আদিবাসীরা পরাধীনই রয়ে গেলাম।

প্রশ্ন-৫। স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য যে যুদ্ধ তা অর্জন করতে এককভাবে অন্য রাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়া কি সম্ভব ছিল?
আমি যুদ্ধের সময়ে সেভাবে ভাবি নি। অন্য দেশের সহযোগিতার কথা তেমন জানতামও না। তবে আজ এটুকু জানি- ইন্ডিয়া এবং অন্যান্য দেশ আমাদের সহায়তা না করলে দেশ স্বাধীন করা অনেক কঠিন হতো। বিভিন্ন দেশথেকে যারা আমাদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন, শুনেছি, তাদেরকে সরকার সম্মাননা দান করেছেন। আমিও তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।

প্রশ্ন-৬।  যুদ্ধকালীন সময়ে আদিবাসী হিসেবে আপনারা হিন্দু বা মুসলিমদের মত ভারতে গেলেন না কেন? সবাই তো কম বেশী ভারতে যাচ্ছিল।
সেসময়ে বাংলাদেশ ভারত বর্ডারের অনেকেই চলে গিয়েছিলো এবং দেশ স্বাধীণ হওয়ার পর অনেকেই ফিরেও এসেছেন। তবে এখানে আমাদের মধুপুর গড়ে সেসময় ঘন বনজঙ্গল থাকায় আমাদের লোকজনদের পালিয়ে থাকার বেশ সুবিধা ছিলো। অন্যদিকে এদিকটা রাস্তাঘাট ভালো না থাকায়, শত্রু পক্ষের লোকেরা সুবিধা করতে পারে নি।

প্রশ্ন-৭। যুদ্ধকালীন সময় বাঙ্গালী, পাহাড়ি, আদিবাসীদের মাঝে কোন পার্থক্য দেখেছিলেন? আর দেখে থাকলে সেগুলোকে কিভাবে দেখেছিলেন?
না, সেসময় বাঙ্গালী, পাহাড়ি, আদিবাসীদের মাঝে তেমন পার্থক্য ছিলো না। বাঙ্গালীদের দ্বারা আদিবাসীরা বিভিন্নভাবে নির্যাতীত, শোষিত বঞ্চিত হচ্ছে তা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। বর্তমানে আমার পত্তনী জমির প্রায় কোনাবাড়ী বাজারে প্রায় দেড় একর জমি সরকারের দখলে। সেখানে পুকুর খনন হয়েছে, আর ইউনিয়ন কাউন্সিল সেটা লিজ দিয়ে রেখেছ। এ জমিটা আমার দখলে থাকলে আমাকে এতটা কষ্টে দিনাতিপাত করতে হতো না। আমার সন্তানদেরও জমিজমা কিছুই দিতে পারি নি।

প্রশ্ন- ৮। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে আপনাদের কি কি সুবিধা দেওয়া হয়েছিলো?
ওরা আমাদের দুইবেলাই খাবার রুটি, ভাত, মাংস দিতো। কোন কোনদিন ফ্রুট, জুস থাকতো। আমি জুনথেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত মাসিক ৫০টাকা বেতন পেতাম। আর এসব দিয়ে আমরা এলাকার অসহায় লোকদেরকেও সাহায্য করেছি।

প্রশ্ন- ৯। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এমন একটি ঘটনার কথা বলুন যা আপনাকে আনন্দ দিয়েছে
তখনতো আনন্দ করার সময় না। তবে, কমান্ডারের নির্দেশে আমরা যেদিন চীন দালবতকে মেয়ে সাজিয়ে গান গাইতে গাইতে নৌকায় যাচ্ছিলাম, তখন আমাদের মনে যেমন শঙ্কাও ছিলো, তেমনই মেয়েরূপী চীনের নাচ দেখে মজাও পেয়েছি। শেষে সন্ধ্যার দিকে শত্রুদের ক্যাম্পের কাছিকাছি গিয়ে গ্রেনেড ছুড়ে দিয়ে আসার পর সকালে যখন জানলাম সব শত্রু মরে গেছে, তখন আমাদের আনন্দ ১০ গুন বেড়ে গেল।

প্রশ্ন- ১০। বাংলাদেশ আজও আদিবাসীদের স্বীকৃতি দিলো না। এখন যদি আপনাকে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়, তখন কি অনত্র চলে যাবেন?
আমরাও জীবনকে বাজী রেখে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি, অনেকেই প্রাণ হারিয়েছে, ইজ্জত দিয়েছে। তাহলে কেনো যাবো এ দেশ ছেড়ে। আমি এদেশেরই সন্তান, আমি এদেশের মাটিতেই মরতে চাই। আফসোস, দেশ স্বাধীন করেও আজও আমরা পরাধীন!

প্রশ্ন- ১১। সবশেষে আমাদের প্রজন্মের জন্য কিছু বলুন
আমরা যেমন নিজের জীবনকে বাজী রেখে দেশের জন্য ঝাঁপিয়ে পরেছি, তেমনই তোমরাও জাতি ও সমাজের জন্য কিছু একটা কর। শিক্ষিত সমাজ হিসাবে গড়ে তোল; তবেই দেশের সকলেই সুখে শান্তিতে থাকতে পারবে। ধন্যবাদ তোমাদের, ধন্যবাদ মানবিক গ্রুপ এবং গ্রামের প্রতিটি মানুষকে।

অসীম সাহসী বীর গারো মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্র সাংমার সাথে আলাপ করতে করতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছিলো। আমরা আসার আগে আরেকবার দেশের অবদানের জন্য উনাকে এবং উনার স্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমরাও বিদায় নিলাম।

পুনশ্চঃ আসুন আমাদের বাড়ি বা গ্রামের আশপাশে অভিমান নিয়ে বসবাসকারী কিংবদন্তী তুল্য এমন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ছোট্ট পরিসরে হলেও সম্মানিত করি। সেল্যুট সকল মুক্তিযোদ্ধা! ধন্যবাদ পাঠকবৃন্দ, ধন্যবাদ সবাইকে।

ছবি ১- স্বস্ত্রীক মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্র সাংমা
ছবি ২- সাক্ষাৎকার গ্রহনকারী ফিডেল ডি সাংমা
ছবি ৩- সাক্ষাৎকার গ্রহনকারী দল
ছবি ৪- মুক্তিযোদ্ধার সনদ
ছবি ৫- - পত্তনীকৃত জমির কাগজ
ছবি ৬- পত্তনীকৃত জমি যেখানে এখন

সোমবার, ১০ মার্চ, ২০১৪

**অন্ধকার** (কিছুটা ১৮+)

**অন্ধকার**

- (বিঃদ্রঃ গল্পটি অতিরিক্ত লজ্জাশীল ব্যক্তিদের পড়া নিষেধ)-

(১)

বেলা পরে যাচ্ছে। চারিদিকে ফুরফুরে হাওয়া। মাঝে মাঝে ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপ্টা লাগছে। শরীরের লোমগুলো দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। ঠাণ্ডায় নয়- উত্তেজনায়। মাঝে মাঝে প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মধ্যেও সেকান্দর ঘেমে নেয়ে ওঠে। সেকান্দর ভাবে, সূর্য ডোবার সাথে সাথে মানুষের আশাও কি ডুবে যায়! অন্ধকারের মতোই কি মুছে যায় ভালোবাসার রঙ?

পাক্কা ১৫ বছর আগে সেকান্দর গ্রাম ছেড়েছে। টাঙ্গাইল, জামালপুর আর ময়মনসিংহ শহরের ঠিক মাঝামাঝি সেকান্দরের পৈত্রিকভিটা। পোড়খাওয়া পরিবারের দরিদ্র পিতার একমাত্র পুত্র সে। গ্রামের নাম চানপুর। গ্রামের নাম চানপুর হলে কি হবে, এ গ্রামের লোকজন চিরজীবনই অমাবশ্যার মধ্যে বাস করে যাচ্ছে। অর্থাৎ অন্ধকারে জন্ম নিয়ে অন্ধকারেই মরেছে। কারণ, এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নেই; নেই এলাকার লোকজনের মধ্যে শিক্ষা এবং সচেতনতা। এখানে বেশির ভাগ লোকের সর্বোচ্চ শিক্ষার মান হল- স্থায়ীভাবে ভাঙ্গা-আধচালার মকতবে ২ বছরের আরবি ও পাক কোরআন-এর কিছু প্যারা মুখস্ত পর্যন্ত। সেকান্দরের বাবার শিক্ষা-দীক্ষাও এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তিনিও মনে করেন, ৫ ওয়াক্ত নামাজের সময় আরবি আর দোয়া বলতে পারলেই মানুষের চলে যায়। তারপর, ক্ষেত-খামারের কাজে বাপ-দাদার কাছথেকে শিক্ষা নিয়ে সেটা কাজে লাগালেই জীবনটা পার করে দেওয়া যায়। এমন লোকদের সচেতনতা দান করার লক্ষ্যে একটি বেসরকারী সাহায্য সংস্থা কাজ করছে। আর ৩ বছরের মাথায় ৩য় শ্রেণী পর্যন্ত প্রায়মারী স্কুল কোনরকমে চালিয়ে যাচ্ছে। পাশের গ্রামে একটা প্রাইমারী স্কুল থাকলেও, এ গ্রামের লোকজনের ধারণা, এতদূরে গিয়ে মূল্যবান সময় নষ্ট করে পড়ার চেয়ে- নিজের ক্ষেত-খামারে কাজের মূল্যটাই বেশি। সেকান্দরের বাবাও তাই মনে করেন। এমন পরিস্থিতির সাথে যুদ্ধ করে এগিয়ে চলা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিয়ে এ গল্পের অবতারণা।

পৌষ মাস। এ সময় ৪র্থ শ্রেণিতে ভর্তিচ্ছুকদের পাশের গ্রামের স্কুলে ভর্তি করানো হয়। একাজটি চানপুরের শিক্ষকরাই করে থাকেন। প্রতি বছর পৌষ মাসে সবাইকে একসাথে নিয়ে ভর্তি করে দিয়ে আসেন। সেকান্দরের ভাষায় আজ রাগী, বেরসিক আক্কেল আলী স্যারের পালা। ৭জন ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি করার কথা। কিন্তু এবছর ১ম স্থান অধিকারিণী ময়না খাতুনের দেখা নেই। সেকান্দরের বাড়িথেকে ময়নার বাড়ি খুব বেশি দূরে নয়। বড় একটা খাল পেরোতে হয়, তবে বছরের বেশিরভাগ সময় এ খালের সাঁকো থাকে না। এই একমাত্র খালটিতে পানি যতই থাক; কারোর কাপড়ই ভিজে না। কায়দা ওদের জানা। পুরুষরা খালটি পারাপারের সময় লুঙ্গি তুলতে তুলতে আর নামাতে নামাতে পার হয়। আর মহিলাদের পারাপারের জরুরী মনে হলে এর সাঁকো ঠিক হয় আর বাকীটা সময়ে ভাঙ্গাই থাকে। আক্কেল আলী স্যার অপেক্ষায় অধৈর্য হয়ে বললেন, কিরে সেকান্দর- ময়নাদের বাড়ি তোদের বাড়ীর কাছে, অথচ ময়নারে ডাইকা সাথে নিয়া আসতে পারলা না? তুই নাহয় এক ক্লাশ উপ্রে পড়স, এইটুক সহানুভূতি দেখাইতেতো পারতা। নাকি মিছা কইলাম? সেকান্দর উত্তর দেয়, স্যার, ময়নার মায় আঙ্গর বাড়ি আইছিলো। কয়ছে, মাইয়া ডাঙ্গর অইয়া গেছে। ভিনদেশে পড়বার দিবো না। বালা সমুন্দ আইলে বিয়া দিয়া দিবো।
-      ছিঃ ছিঃ এইডা কি কথা। সেদিনইতো ওদের বাড়ি গিয়া আলাপ পাইড়া আইলাম।
-      হ স্যার। আমার আম্মাও বুঝায়া দিছে-
-      থাইক, তর হিস্টোরি শুইন্যা দেরী করন যাইবো না। লও- তুই আর আমি দুইজনে যাইয়া ময়নারে নিয়া আসি। বাকীরা তোমরা আগাইতে থাক-
স্যারের এমন আদিখ্যেতা পছন্দ হল না। ওরে আমার বাসায়া (অপেক্ষা করে) আনন নাগবো, এত ঠ্যাকা ক্যাকথাটা বলতে ইচ্ছে করছিলো সেকান্দরের। তার ধারণা- সেও চালু পোলা।

স্যারের উচ্চতা অনেক বেশি। লম্বা লম্বা পা। তাই তার পেছন পেছন হাঁটা মানে হাঁটা নয়; প্রায় দৌড়ের কাছাকাছি। সেকান্দর রাগে গজ গজ করলেও বাধ্য ছেলের মতো স্যারের পেছন পেছন হাঁটে।
-      সেকান্দর তুই ওদের বাড়ি যা। গিয়া ময়নারে নিয়া আয়। ওর বাপমায় না ছাড়বার না চাইলে, কইবা- ময়নার জন্যে এত ভাবতে হয়বো না।
-      তারপরেও যুদি না ছাড়ে-
-      তারপরেও যদি না ছাড়ে, কইবা- স্যার খাল পাড়ে ময়নার অপেক্ষায় খাড়ায়া আছে।
-      স্যার, সাঁকো বাঙ্গা। পানি মুন্নয় আমার কোমরের উপ্রে অবো
-      তাতে কি, নাইম্যা পানি ভাইঙ্গাই যা। লুঙ্গি পরছস অসুবিধা নাই। ডরেরও কিছু নাই, শরমেরও কিছু নাই। পানি বেশি অইতে থাকবো, তর লুঙ্গি তুলতে তুলতে যাবা। আর পানি কমতে থাকবো, তুইও লুঙ্গি নামাইতে থাকবা। কেউ দেখবো না- এই আমিও ঘুইরা খাড়াইলাম।
আক্কেল আলী স্যার সেকান্দরের প্রত্যুত্তরের প্রয়োজন মনে করছেন না, তবে ছেলেটার জন্য মায়া হচ্ছে। শীতকাল। তার উপর এ খালের পানি সবসময়ই ভীষণ ঠাণ্ডা থাকে। পানির ছরছর করা আওয়াজটা বলছে- সেকান্দর পার হয়ে যাচ্ছে। তিনি পেছন ফিরেই সিগারেটের মাথায় দিয়াশলায়ের কাঠি দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়ে বললেন, চিন্তা করিস না সেকান্দর। কাইলই এখানে একটা সাঁকোর ব্যবস্থা করে ফেলবো।
স্যার, এম্মুরা (এদিকে) তাকাবাইন না, আমি শরম পামু...। .ছেলেটা মালকোঁচা দিয়ে নেমেছিলো। এবার খুলেছে বোধয়; হয়তো ছেলেটা আগেথেকে পানির গভীরতা আন্দাজ করতে পারে নি। পোলাপান মানুষ, এখনই তোর শরম কিরেবলতে বলতে আক্কেল আলী স্যার আবার সিগারেটে মনযোগ দেন।

সিগারেটটা শেষ হবার আগেই সেকান্দর ওপারথেকে বলছে, স্যার একটা বাঁশ নিয়া আইছি। এইটা ফালায়া দরলেই ময়না পারয়া যাইতে পারবো। স্যার, বাঁশের ঐ মাথায় আপনের একটু দরন নাগবো। আচ্ছা, ভালা কাম করছস। বাঁশের মাথাটা এপারে আগায়া দেও, আমি ধরি। কিরে ময়না তরে মায় ছাইড়া দিল?’ সেকান্দর বাঁশটা আড়াআড়ি রাখার পর ময়না কিছু দূর এগিয়ে আসে। কিন্তু মাঝখানে এসে বাঁশটাএখন ভীষণ দুলছে। ময়না ভয় পাচ্ছে দেখে আক্কেল আলী স্যার বলেন, সেকান্দর তুই পানিতে নাইম্যা যা। বাঁশের মাঝখানে ধইরা থাক। মাঝখানের পোতা বাঁশটা দুর্বল অইয়া গেছে মনে হয়। .বাঁশের আরেক মাথা ছেড়ে দিয়ে সেকান্দর লুঙ্গিটা ছোট করে কোমরে গিঁট দেয়। তারপর পানিতে নেমে মাঝখানে ধরে রাখে। তবে, উপকার করতে গিয়ে হয়েছে আরেক বিপদ। বাঁশ আর ময়নার ভারে সেকান্দরের কিছুক্ষণ আগের হাসি মুখ ভোঁতা হয়ে গেছে। ভারে আর বিরক্তিতে সেকান্দর মুখ কুঁচকায় আর দাঁত কটমট করতে থাকে।

ময়না পার হয়ে আসার পর সেকান্দর বাঁশটা ওপারে রেখে নিজেও পার হয়ে আসে। পায়ে কাদা লাগাতে ধোয়ার জন্য ময়না পারে দাঁড়িয়ে পা চুবিয়ে নিল। সেকান্দরেরও লুঙ্গির অর্ধেক অংশ ভিজে গেছে। তাই সেকান্দর লুঙ্গিটা তুলে ছিপে পানি বের করতে থাকে। কাপড়টা একটু সাবধানে তোল বাপসেকান্দরের অবস্থা দেখে আক্কেল আলী স্যার না বলে পারলেন না। কৌতুহল ছিল না, তবু স্যারের বলার সাথে সাথে ময়না সেকান্দরের দিকে তাকায়। ওর জিনিসটা ঠাণ্ডায় জমে এই এতটুকুন হয়ে গেছে দেখে-  ফিক করে হাসে ময়না। ময়নার দিকে তাকিয়ে সেকান্দরের কানটা ঝাঁঝাঁ করতে লাগল। তারপরথেকে লজ্জায় সারা রাস্তায় দুজনের চাওয়া-চাওয়ি কথাবার্তা বন্ধ।

(২)

-      বহ দোস্ত বহ। কি খবর। ম্যালাদিন কোন খবর নাই। আইজ এতদিন পর হুট কইরা আসলা-
-      হ। তরা কিবা আছ? আর চাচা-চাচি ওরা?
সেকান্দরের কথা শেষ না হতেই শৈশবকালের বন্ধু আবু তালেবের মুখে কথার তুফান বইতে লাগল। আবু তালেবের ছোটবেলাথেকেই সে একই স্বভাব। কথার মাঝখানে কখন দম নেয়, ঠিক বুঝা মুশকিল। সেকান্দর সুযোগ খুঁজে কখন, কিভাবে ময়নার কথা পারবে। বেকুবটা নিজেথেকে বলছেও না। দোস্ত ভাবীরে কও এক গ্লাস পানি দিতে। গলাটা শুঁকায়া গেছেভাবী কও ক্যা, ফরিদা। হ, হেই ফরিদা খাতুন। যার পিছে ম্যালাদিন নাইগ্যা (লেগে) আছিলাম’- সেকান্দর হাসে। ও তাই? শ্যাষমেশ তুই ফরিদারেই-। .সেকান্দরের কথা শেষ না হতে বলে, ‘খালি বিয়া না, তিনডা বাইচ্চার জরম দিসি। .আবু তালেব বিজয়ীর মত হাসে। ‘‘ও গেন্দির মা- দোস্তের নিগা এক গেলাস ঠাণ্ডা পানি দিয়া যাও। বুচ্ছো ভাই, মাইনসে যখন কয় বসন্তকাল, তখন আমি কই চৈতমাস। কপাইল্যাগর মনে জাগে প্রেম, আর আকপাইল্যাগর শুকায় গলা, হা হা হা। তাইলে দোস্ত, তুই একটু জিরা, তারপর হাত-মুখ ধুইয়া আহ, হাল্কা নাস্তা খাবা। আর ততক্ষনে আমি কয়ডা কাঁচা বাজার কইরা, গরুডাও নিয়া আহি- বলতে বলতে উঠে দাঁড়ায় আবু তালেব। তারপর কিছুটা ঝুঁকে লুঙ্গির উপর দিয়ে কচকচ করে চুলকোতে থাকে। সেটা দেখে সেকান্দরের বিরক্তিটা গিয়ে পরে লুঙ্গিটার উপর। বিরক্তির কারণ তার সেই ছোটবেলার লুঙ্গি কাহিনী। যে ঘটনা সেকান্দরকে এখনও ভীষণভাবে বিব্রত করে, লজ্জা পায়। কাহিনী আরও আছে; প্রথমতঃ লুঙ্গি পরে ঘুমানোর পর সকালে সে লুঙ্গি খুঁজে পায় তার গলায়, আর নাহয় খাটের তলায়। দ্বিতীয়তঃ লুঙ্গি পরে হাঁটলে তার নিচের দিকটা ভীষণ খালি খালি লাগে। তখন মনে হয়, আশপাশের সব লোকজন বোধয় তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। তৃতীয়তঃ মাঝে মধ্যে মাছেরা যেমন পানির ভেতরে থেকে শ্বাস নেওয়ার জন্য হা করে উপরে মাথা বের করে, লুঙ্গি পরে বসলে তার জিনিসটাও ওরকম করে বলে মনে হয়। তাই বাধ্য হয়ে সেকান্দরকে তার লুঙ্গিটা সবসময় চেপে ধরে থাকতে হয়। একারণে ঢাকা শহরে যাওয়ার পরথেকে লুঙ্গির উপর ক্ষ্যাপা সেকান্দর পারতপক্ষে শুধু প্যান্টই পরে।
তাড়াতাড়ি ফিরবেন। আর ভায়ের জন্য বড় দেইখ্যা একটা মাছ নিয়া আইবেনবলেই একহাতে গ্লাস আর আরেকহাতে জগে ভরা পানি নিয়ে এসে সামনে এসে দাঁড়ায় ফরিদা। পানির জন্যে হাত বাড়াতে বাড়াতে সেকান্দর বলে, কিরে ফরিদা। তুমিতো দেখছি আগের থেকেও বেশি সুন্দর হয়ে গেছ। বিয়াশাদী করলে সব মাইয়াই এমন সুন্দর হয়? ফরিদা হাসে। কি খবর বোইন, তরা ভালো আছ?
-      হ বড় ভাই। আপনি কেমন আছেন?
-      এইতো যা দেখতাছ। বলা যায়, ভালোই আছি।
-      আপনিতো ভালোই আছেন, আর ময়নার খবর রাখছেন কিছু?
-      নারে, বলতে পারস- তোদের সবার খোঁজ লইতেই আমার গ্রামে আসা-
-      ময়না কেমনে ভালো থাকবো কন। সেই যে আপনারা সবাই চইলা গেলেন, আর আইলেন না। এদিকে ময়না চোখের পানি ফালাইতে ফালাইতে গাং বানায়া ফালাইলো। আহারে ছেরিডা-
-      কেন ফরিদা, ময়নার কি হয়ছে?
কথাটা বলেই সেকান্দরের বুকটা দুরুদুরু করে কাঁপতে থাকে। যার জন্যে এতদূর ছুটে আসা- সে কি নিষ্ফল হয়ে ফিরে যাবে? সেকান্দরের মনে পরে, প্রায় ১৫ বছর আগে বাবার সাথে সে গ্রাম ছেড়েছে। অবশ্য সে দায় সেকান্দরের নয়; বাবা এবং চাচাদের। দাদুর মৃত্যুর পর খালের পানিতে বাড়ি-ভিটাটাও ভেঙ্গে গেল। তারপর বাবা-চাচাদের সাথে পৈত্রিক সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব বাঁধে। সেদিনথেকে বাবা অভিমান করে গ্রাম ছেড়ে সবাইকে ঢাকায় গেছেন। ছোট্ট মুদির দোকান খুলে সংসার শুরু করেছেন। চাচাদের সাথে জিদ করে বাবা নিজেও গ্রামে আসেন নি, আর কাওকেই আসার নাম পর্যন্ত নিতে দেন নি। একারণে প্রচণ্ড টান আর ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সেকান্দরের গ্রামে আসা হয় নি। সেকান্দরকে শহরের স্কুলে ভর্তি করে দেওয়ার পর পাশ করতে করতে এবার সে বিএ পরীক্ষা দিয়েছে। তাই বাবার কাছে অনেক অনুরোধের পর এবার গ্রামে আসার সুযোগ পেল।
-      হেতে আর কেমুন থাকবো ভাই।
-      ক্যান, কি হয়ছে?
-      হওনের আর কি বাকী আছে বড় ভাই। আপনেগর শহরে চইল্যা যাওনের পরথিকা ময়না পত্যেকদিন ইস্কুলে যাওয়া-আসার সময় একবার কইরা আমগর বাড়িত আয়তো। খালি আপনের কতা জিগায়তো আর গুফনে চোখের পানি ফালায়তো। আহারে ছেরি! হেরে দেইখ্যা মাজে-মইদ্যে আমার মনে অয়তো, হের দম বুজি আইটকা যায়-
ফরিদার কথাগুলো শুনতে শুনতে সেকান্দর ঘোরের মধ্যে চলে যায়। হাইস্কুলে পড়ার ২ বছরের মাথায়; একদিনের কথা মনে করে সেকান্দর। সেদিন স্কুলথেকে ফেরার সময় ময়না তার সামনেই সাঁকো পেরোতে গিয়ে ঝুপ করে পানিতে পরে গেল। তার জানা ছিলো না গ্রামের মেয়ে হয়েও ময়না সাঁতার জানে না। কিংকর্তব্যবিমুঢ় সেকান্দর কিছুক্ষণ থেকে সেও পারে বই ছুঁড়ে রেখে ঝাঁপিয়ে পরল। পানিথেকে টেনে হিঁচড়ে ময়নাকে যখন ডাঙ্গায় তুলল, তখন ময়না দাঁড়িয়ে মাথাটা নীচু করে সামনে ঝুঁকে ভয়ে কাঁপছে। লজ্জারাঙা মুখে পুঁটি মাছের মত খাবি খাচ্ছে। অনেকদিন আগে সেকান্দরের জিনিসটা উন্মুক্ত হবার পর ময়নার দিকে ভালো করে কোনদিন তাকায় নি পর্যন্ত। আজ ময়নাকে সে খুব মনযোগ দিয়ে দেখছে; এবং এ মূহুর্তে ময়নাকে তার নতুন মনে হচ্ছে। কিন্তু কেন মনে হচ্ছে? জলপরিরাও এমন সুন্দর হয় কিনা গল্প বইয়ের পোকা সেকান্দর জানে না। লাল-নীল পরীরা দেখতে কেমন, তা কোনদিন কল্পনাও করে নি সে। মৎস-কন্যারাও কি পানিতে ভিজে? কিন্তু ময়নার সারা শরীর ভিজে চুপসে গেছে। ভাগ্যিস কয়েক ঢোক পানি গিলেই রক্ষা হয়েছে, নাহলে কিযে হতো কে জানে। ময়নার সালোয়ার-কামিজ বেয়ে টপ-টপ করে পানি ঝরছে। তখন পশ্চিমের সূর্যটা কোনভাবে ঝুলে থেকে তার রক্তিম আভা ছড়িয়ে দিয়েছে। আ-আমার ও-ওড়নাটা কই-ময়না কাঁপা কাঁপা গলায় প্রশ্ন করে। চমকে গিয়ে সেকান্দর এদিকওদিক তাকায়। একসময় দেখে দূরে- খালের মাঝপানিতে ভেসে যাচ্ছে ময়নার আবরন।

(৩)

গেন্দির মা, বাজারে তেমন কিছু পাওয়া যায় নায়। নেও সদাইগুলা ধর। দোস্ত হারাদিন কিছু খায় নায়। তাড়াতাড়ি রাইন্দালাও। আমি গরুডা গোয়ালে তুলিবলেই আবু তালেব তার কাঁধের গামছাটা দিয়ে মুখের ঘাম মুছে। ফরিদা যখন বাজারের ব্যাগটা নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে গেল তখন আবু তালেব ফিসফিসিয়ে বলে, ‘দোস্ত ময়নারে খবর দিয়া আইছি। খালপাড়ে আহনের কতা। সাবদানে যাও, ফট কইরা দেহা কইরা আস
কথাগুলো শুনেই সেকান্দরের সারা শরীর আবার চাঙ্গা হয়ে ওঠে। যেন ঐশ্বরিক বলে শক্তি ফিরে পেল। এখনই যাবো?’ ‘না, একটু পরে যাও। ওর আইতে দেরিও অইতে পারেবলেছিল আবু তালেব কিন্তু সেকান্দরের তর সইল না। তাই সে হিসু করার অজুহাতে বেরিয়ে পরল।

খালপাড়ে চলে এসে দেখে কোথাও কেউ নেই, চারিদিক কেমন খা-খা; শুন্যতা। ময়না আসলে কি হবে, আর কথাটা কিভাবে বলবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। এলোপাথাড়ি ভাবতে ভাবতে সেকান্দর গাছের গোড়ায় হেলান দিয়ে বসে পরে। ক্লান্ত শরীর। বেশ কয়েকদিন যাবত সে অসুস্থ্য ছিল। তার উপর সারাদিন খাওয়া নাই। এখন সেকান্দরের শরীরটা হেলে পরতে চাইছে। গাছের গোড়ায় হেলান দেওয়ার পর চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসছে। খালপাড়ের চারিদিক হিম শীতল বাতাস বইছে। সেকান্দর ভাবে, এসব কাজে পৃথিবীর কোন মানুষকে যেন এভাবে অপেক্ষা করতে না হয়। কী নির্মম এই অপেক্ষার সময়টা। তর সইছে না, তবুও কেমন ঘোরের নেশায় পেয়ে বসে সেকান্দরকে।

ঐতো খালের ওপারে ছায়ামানবী ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে। হ্যাঁ ময়নাইতো। খুব সাবধানে এদিকওদিক তাকিয়ে সামনে পা ফেলছে। হাঁটার সময় ময়নার শরীরটা যেভাবে দোলে, তা সেকান্দরের চেনা। এখন সেভাবেই শরীরটা দুলছে আবার থামছে। দুলছে আবার থামছে। আনন্দ-উচ্ছ্বাসে, আবেগে সেকান্দরের মন থৈ থৈ করতে শুরু করল। আবার চোখের সামনে ভাসতে থাকে ছেলেবেলার সেই ঝকঝকে দৃশ্যগুলো। লুঙ্গি পরা সেকান্দর খালের মাঝপানিতে নেমে সাঁকোর এক পা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিশোরী ময়না তার ফর্সা, আলতারাঙা পায়ে ধীরে ধীরে এগুচ্ছে। সেকান্দরের কাঁধের উপর দিয়ে খুব সাবধানে সাঁকো পার হয়ে আসছে ময়নার পা দুটো। কিন্তু ময়নাকে আজ বাতাসের মত কেমন হালকা মনে কেন? ভালবাসলে কি মানুষের শরীর হালকা মনে হয়! নাকি ময়নাই ভালোবাসার মানুষকে কষ্ট দিতে চাইছে না বলে নিজের ভারটাকে হালকা করে দিচ্ছে। এ কি কখনও সম্ভব? আবার দেখে সেকান্দর, বোঝার চেষ্টা করে। ঠিকইতো! ময়না তার কাঁধের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। না, কোন কষ্টই হচ্ছে না তার, বরং নিজেকে খুবই নিষ্ঠাবান, দায়িত্ববান অভিভাবকের মত মনে হচ্ছে। যাকে সেকান্দর ভালোবাসে, আজ সে মাথাথেকে শুরু করে বুকের উপর দিয়ে হেঁটে গেলেও বোধয় কোন কষ্টই হবে না তার। সেকান্দর বোঝার চেষ্টা করে, চোখের পলকে ময়না যেন ভয়াবহ সাঁকোটা নির্বিঘ্নে পার হয়ে গেল।

সেকান্দর কোনদিন যা করে নি, আজ সে তাই করল। সে ময়নার হাত ধরে পাড়ে নিয়ে এসে দুজন দুজনার খুব কাছাকাছি, মুখোমুখি দাঁড়ায়। দুজনই দুজনার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। ভালোবেসে যে সীমাহীন শান্তি, এতোটা তৃপ্তি; ভাবতেই পারে নি সেকান্দর। কারো মুখে কোন কথা নাই। ওদের কথা হয় শুধু চোখের ইশারায়, মনের ভাষায়। আজ যেন জন্ম-জন্মান্তরের একই অঙ্গ, একই মন, একই আত্মায় আবদ্ধ। তারপর অক্টোপাশের মত ওরা দুজন দুজনকে জড়িয়ে কতক্ষণ ছিল; কেউ জানে না।

সেকান্দরের হঠাৎ মনে কেন মনে হল- সারাপৃথিবী দুলে দুলে উঠছে। প্রচণ্ড বেগে ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝর বয়ে যাচ্ছে। চারিদিক অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছে। আর খুব ক্ষীণ স্বরে, দূরে- বহুদূরে কেউ যেন তার নাম ধরে সে-কা-ন্দ-র, সে-কা-ন্দ-রবলে ডাকছে। হ্যাঁ, ঠিকইতো। এইতো, এখন প্রায় স্পষ্টই সে শুনতে পাচ্ছে- সেকান্দর, এই সেকান্দর। দোস্ত, এই দোস্ত- তাড়াতাড়ি ওঠবলে আবু তালেব ডাকছে। সাথে সাথে তাকে ধরে ঝাঁকুনিও দিচ্ছে। ঘোরের মধ্যেই সেকান্দর কিছু বুঝার চেষ্টা করছে, কিন্তু কোন কথা মুখ ফুটে বের হচ্ছে না। সোজা হয়ে বসার চেষ্টা সে করল, বুঝার চেষ্টা করেই যাচ্ছে সে। তার কি হয়েছে? সেই কি ঘুমিয়ে পরেছিল? অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও সেকান্দর কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। নির্বাক, শুধু ফ্যালফ্যাল করে আবু তালেবের দিকে তাকিয়ে থাকে। আবু তালেব আবার বলে, দোস্ত- তর কি হয়ছে? তরে এত ডাকতাসি। তুই এইহানে এত ঠাণ্ডার মইদ্যে ঘুমায়া আসস ক্যা? আর ওইদিকে কি অইছে জানস? তর কাছে আসনের সময় ময়নারে ওর স্বামী ধরছে। আর তারে টাইন্যা হ্যাঁচড়ায়া বাড়িত নিয়া মাইর-ধর কইরা হেষে গলা টিইপ্যা মাইরালাইছে।


হঠাৎ সেকান্দরের মনে হচ্ছে, চারিদিকে ঠাঠা শব্দ করে এইমাত্র মাথায় বজ্রপাত হয়ে গেল। সেশব্দে স্পষ্ট কোন কথা শোনা যাচ্ছে না, কোন কথার কোন মানে বুঝা যাচ্ছে না। আবু তালেবের কথাগুলো ধীরে ধীরে ক্ষীণথেকে ক্ষীণতর হচ্ছে, সারা পৃথিবী সীমাহীন অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছে ... 

শনিবার, ২ নভেম্বর, ২০১৩

আমার বিশ্বাস, “বিশ্বাসে মিলায় বস্তু; তর্কে বহুদূর...”!


আমার বিশ্বাস, “বিশ্বাসে মিলায় বস্তু; তর্কে বহুদূর...”!

November 2, 2013 at 9:34pm
.
ফিডেল ডি সাংমা
.
গারো সমাজ মাতৃতান্ত্রিক সমাজ। আমাদের এই সমাজে নারীর মর্যাদা অনস্বীকার্য; অনেক উঁচু মানের এবং তা  উল্লেখযোগ্য। সন্তান-সন্তুতির পদবী হয় মায়ের থেকে, পিতৃতান্ত্রিক সমাজের মতো পিতার পদবিথেকে নয়। যেমন ডরথি নকরেকের কন্যা হবে- জাজং নকরেক, চাসং নকরেক, রাসং নকরেক, চিংআ নকরেক। অতএব, একটা পরিবারে, গোষ্ঠ্যিতে মেয়ে সন্তান না হলে চলে না, বংশ রক্ষা হয় না। গারোদের প্রথা অনুসারে, পরিবারের মেয়েরাই সম্পদের মালিক হবেন। কন্যা সন্তানদের জন্য আপন ভাগ্নে অথবা আত্মীয়তার সূত্রে ভাগ্নে সম্পর্কের ছেলেকে জামাতা হিসাবে নিজ বাড়িতে এনে বিয়ে দিবেন এবং জামাতা ঘর সংসারে অভিজ্ঞ হলে তাদের আলাদা ঘর করে দিয়ে আলাদা করে দিবেন। সর্বশেষ কন্যাই হবেন ‘নকনা’; যার বরকে ঘর জামাই মনোনিত করা হয়। এই ঘর জামাইয়ের আসন, দায়িত্ব, মান-মর্যাদা ইত্যাদি অন্যান্য জামাতাদের থেকে ভিন্ন; বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন। কেননা, তিনিই শ্বশুর-শাশুড়ির বর্তমানে, অবর্তমানে তার ঘর সংসার, পরিবার আর গোষ্ঠ্যীর সবাইকে দেখভাল করবেন, শ্বশুরের সহায় সম্পত্তি সুরক্ষা করবেন। নিজ পরিবারের সকল সামাজিকতা- বিয়ে, শ্রাদ্ধ, মানসা ইত্যাদি এবং বিভিন্ন ধরনের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সমাজে মান মর্যাদা বজায় রেখে শ্বশুরের মুখ রক্ষা করবেন, উজ্জ্বল করবেন। অর্থাৎ পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পুত্র সন্তানদের পিতামাতা ও পরিবারে দায়িত্ব পালনের মতো এ জামাতাই শ্বশুর শাশুড়ির বৃদ্ধ বয়সে তাদের ছেলে-সন্তানের দায়িত্ব পালন করবেন। এটাই গারো সমাজের প্রচলিত সনাতন প্রথা। যদিও আধুনিককালে গারোদের মধ্যে কোথাও কোথাও এই সমাজ ব্যবস্থাকে মানতে চান না, কিংবা আংশিক মানেন এবং কেউ কেউ পরিবর্তনের, পরিমার্জনের পক্ষে।
.
এবার নিজের গল্প বলি। আমার শাশুড়ি ছিলেন তার মায়ের একমাত্র কন্যা। আর শাশুড়ির ঘরে তিন কন্যা [এবং দুই পুত্র]; এর শেষ কন্যাই হলেন আমার স্ত্রী। প্রথম কন্যার ঘরে আছে দুই কন্যা এবং এক নাতনী। কিন্তু পরের দুই কন্যার ঘরে কন্যাসন্তান নেই। বলে রাখা ভালো- আমি; মানে এ হতভাগাই হচ্ছি সেই ঘরজামাই। আমাদের  নিজ পরিবারে, গোষ্ঠ্যীতে এবং সমাজের লোকজনেরও ন্যুনতম একটি কন্যা সন্তানের প্রয়োজন বোধ করছিলো।
আমরা স্বামী-স্ত্রী এ যুগের মানুষ। আমরা এ সমাজে বাস করি, এ সমাজকে ভালোবাসি, সম্মান করি। তবুও মুক্তমনা হিসাবে, আধুনিককালের মানুষ হিসাবে এ সমাজের প্রথাকে, রীতিনীতির ভালমন্দ বাছ বিচার করে চলতেই ভালোবাসি। এমনকি ধর্মের ক্ষেত্রেও আমি মৌলবাদী নই। এই বিশ্বাসথেকেই সকল ধর্মকেই আমি শ্রদ্ধার চোখে দেখি। বরং একজন আরেকজনের ধর্মের নিন্দা করতে শুনলে আমার পিত্তি জ্বলে যায়, তার মৌলবাদিতার টুটি টিপে দিতে ইচ্ছে করে। আমার বিশ্বাস, কোন ধর্মই মানুষের অকল্যাণ চাইতে পারে না। পারতপক্ষে, অপ্রয়োজনীয় প্রথা বা রীতিনীতির কাছে জিম্মি হতে চাই না। তাই আমাদের পরিকল্পনা- ছেলে হোক, মেয়ে হোক দুটি সন্তানই নেবো আমরা। সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে পারলে ছেলেরাও মেয়েদের দায়িত্ব পালন করতে পারে, যেমন পিতৃতান্ত্রিক সমাজের তথা বাঙ্গালী হিন্দু সমাজে হচ্ছে। দুই পুত্র সন্তানের পর আমরা আর সন্তান না নেবার সিদ্ধান্ত আমাদের, কিন্তু বাঁধ সাধলেন আমার শাশুড়ি। শাশুড়ির নির্দেশ- পরিবারে একটা কন্যা সন্তান চাই; তার নাতনী চাই। নাহলে বংশ রক্ষা হয় না, আর নাতনির মুখ না দেখতে পারলে মরেও তিনি শান্তি পাবেন না ইত্যাদি। শ্বশুর অনেকদিন আগেই গত হয়েছেন, তিনি থাকলে হয়তোবা আরও কঠিন ফতোয়া জারি করতেন। শ্বশুর উনার জীবিতকালে কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতেন, আমরা এতোগুলো সন্তান লালন-পালন করলাম, আমার বংশধরও তা পারবে। এমনিতে এই দেশে আমাদের জনসংখ্যা কম, তাহলে হিসাব করে সন্তান নিতে হবে কেন ইত্যাদি। এদিকে সন্তানদের মামারাও সুযোগ পেলেই বলতেন, “চিংনাদে আমানি নককো মি’ফাল চটনাজক” অর্থাৎ মায়ের ঘরে আমাদের ভাত ফুরিয়ে যাচ্ছে। আমরাও তাদের খুশি রাখতে চাই, তাই আমি আমার স্ত্রীকে প্রস্তাব দিলাম, মেয়েদের বয়স ৩৫ হলেতো রিস্ক হয়ে যায়, তাছাড়া আমি থাকি (চাকরিসূত্রে) বাড়ির বাইরে, আর তুমি একা সংসার সামলাও। কষ্ট আমার চেয়ে তুমিই বেশি করছ। আবার প্রয়োজনের সময় কারোর সাহায্য সহযোগিতা পাওয়া বা বেশি মজুরি দিয়েও তেমন কাজের লোক পাওয়া যায় না। সুতরাং চল- আমরা একটা কন্যা সন্তান দত্তক নিই। কিন্তু তিনি রাজী হলেন না। বললেন, তুমি যে আমার কষ্টটা বুঝ, এতেই আমি খুশি, পরেরটা আমি বুঝবো। আমার কষ্ট হোক, তবু আমি আমার মায়ের খুশি মুখ দেখতে চাই।

দ্বিতীয় সন্তানের অনেক বছর পর আবারও একটি ছেলেই হলো। যদিও তাতেও কেউই অখুশি হলেন না; আর পিতামাতা হিসাবে আমরাতো নইই। কিন্তু শাশুড়ি এবং অন্যানদের পুরানো রেকর্ড বাজিয়েই চললো, একটি হলেও আমাদের ঘরে মেয়ে সন্তান তাদের চাই-ই। দুর্ভাগ্য যেখানে ভর করে সেখানে মানুষ কি আর কিইবা করতে পারে? পরের তিন বছরের মাথা আরও একটি সন্তান হলো পুত্র এবং এম্যাচিউরিটির কারণে এই পুত্রের আয়ু ছিলো মাত্র দেড় দিন। এদিকে আমাদের “ঘর সামলাবো না পর সামলাবো” অবস্থা।
.
তারপরের দিনগুলোতে আমরা সিদ্ধান্তহীণতায় কাটিয়ে দিলাম। একদিন আমার স্ত্রী বাইরেথেকে এসে বললেন, চল আমরাও বারমারী তীর্থে যাই।
-       কেন?
-       সবাই যাচ্ছে, গ্রামের লোকেরা বাস রিজার্ভ করছে।
-       তা করুক, তুমি গেলে মাকে (শাশুড়িকে) দেখবে কে? তাছাড়া বাড়িতে রেখে যাওয়ার মতো লোক নাই।
-       না থাক, আমি ধর্মের কাজে যাবো, ঈশ্বরই দেখবেন সবকিছু।
-       তাতো বুঝলাম, ধর্মতো ঘরে বসেও করা যায়, তীর্থে যাবে কিসের জন্য?
-       একটা মেয়ের জন্য?
-       মানে...? (আমি ভাবছিলাম, কাজের জন্য মেয়ে খুঁজতে চাইছে)
-       হ্যাঁ, আমি শুনেছি, সবাই বলাবলি করছে। ওখানে যারা বিশ্বাস নিয়ে যায়, প্রার্থনা করে, মা মারিয়া তাদের প্রার্থনা শুনেন। অনেক রোগী সুস্থ্যও হয়েছেন ইত্যাদি...
-       ঠিক আছে যাও। বাচ্চাদের সাথে নেবে?
-       শুধু বাচ্চাদেরই না, বাচ্চাদের বাবাকেও যেতে হবে। বাচ্চাদের আমি একা সামলাতে পারবো না। তুমিও আমার জন্য একটা মেয়ে চাইবে। (আমি নির্বাক থেকে তার কথায় সমর্থন দিলাম।)

যথারীতি তীর্থের সময় হয়ে এলো। যেখানে আমি চাকরি করি, সেখানকার খ্রিস্টভক্তরাও যাবেন। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আমাদের অফিস তাদের আর্থিকভাবে আংশিক সহযোগিতা দিচ্ছে। তাই তাদেরও আবদার, গাইডের মতো করে অফিসের লোকজন তাদের সাথে থাকলে ভালো হয়, তাই আমাদের অফিস কর্তৃপক্ষ স্টাফদের মধ্যথেকে বেশ কয়কজনকে সেখানে যাওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হলো। সেসাথে ইচ্ছুক যারা, তারা সপরিবারে যাবার সুযোগটাও পেল এবং যথারীতি ব্যাগ, ছোট খাটো বিছানাপত্র আর কিছু শুকনো খাবারসহ আমরাও গেলাম।
.
তীর্থস্থানে পৌঁছার পর দেখলাম চারিদিকে লোকে লোকারণ্য। ব্যাগ, বিছানাপত্র রাখারও জায়গা নেই। শেষে কোন এক সিস্টারের পরামর্শে গীর্জাঘরের এক কোণে সেগুলো রেখে প্যান্ডেলে গিয়ে দেখি, দাঁড়াবারও জায়গা নেই। অনুমানিক ২০ হাজার লোক হবে। চারিদিকে মাইক ফিট করা থাকায়, মূল অনুষ্ঠান শোনার, অংশগ্রহণ করার কোন অসুবিধাই রইলো না। প্রথমে পাপস্বীকার অনুষ্ঠান হলো, দ্বিতীয়ভাগে খ্রীস্টযাগ। তারপর আলোক সজ্জার মাধ্যমে প্রায় দেড় কিমি উঁচু নিচু পাহাড়ি পথে মালা প্রার্থনায় অংশগ্রহণ করলাম। রাত্রে কিছুক্ষণ বিরতির পর, বিভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে প্রার্থনানুষ্ঠানের পাশাপাশি যেখানে কুমারী মারিয়ার মূর্তি রাখা হয়েছে, সেখানেও সবাই গিয়ে ভক্তিভরে প্রার্থনা করতে লাগলো। আমার স্ত্রীও আমাকে বললেন, চল আমরাও সেখানে যাই। তখন রাত প্রায় দেড়টা। অনেক ক্লান্তি নিয়ে যেতে ইচ্ছে করছিলো না। স্ত্রী বললেন, সেখানে গিয়ে প্রার্থনা করতেইতো আমরা এসেছি, এমনি এমনি ফিরে যাবো? তার আবদার উপেক্ষা করা গেলো না, তীরে এসে তরী ডুবলে চলে না। অগত্যা পাহাড়ের অনেক উঁচুতে উঠে কাছে গিয়ে খুব মনযোগ ও ভক্তিসহকারে প্রার্থনা করলাম। আমি জানি, আমার স্ত্রী একটি মেয়ে সন্তানের আশায় এতদূর এসেছে, তাই আমিও আমার স্ত্রীর ইচ্ছা পূরণের জন্য প্রার্থনা করলাম। বললাম, “মাগো, আমাদের সংসারে ঠিক তোমার মত সুন্দর মনের অধিকারী একটি কন্যা সন্তান দাও”।
.
তার ঠিক এক বছর পর আমাদের একটি সন্তানের মুখ দেখলাম, কি অবাক করা ফুটফুটে সুন্দর মুখ। জন্মের পর পরই আমার কোলে চলে এলো। মনে হচ্ছিলো, এই মূহুর্তে আমিই পৃথিবীর সর্বোচ্চ ভাগ্যবান গারো পিতা। যাই হোক, যাকে ঘিরে এত স্মৃতিচারণ; এত কথা, সেই হচ্ছে আমাদের একমাত্র কন্যা সন্তান ‘চিংআ’। আজ ২ নবেম্বর চিংআর ৪র্থতম জন্মদিন। আপনারা সবাই আমাদের এই মেয়েকে এবং আমার ৩ রত্ন পুত্রদের জন্য আশীর্বাদ করবেন, প্রার্থনা করবেন এবং যাচ্ঞা পূরণকারী মহান সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিবেন।
.
পরিশেষে একটা কথা বলে লেখার ইতি টানতে চাই। তাহলো- এ লেখায় আমি আমার বিশ্বাসের কথা লিখলাম, আমার স্ত্রীর বিশ্বাসের কথা লিখলাম এবং আমাদের পরিবারের কথা লিখলাম। আমরা বিশ্বাস করি, এ আমাদের মেয়ে চিংআ, আমাদের বিশ্বাসপূর্ণ প্রার্থনার ফল। আমার এ লেখার কথার পক্ষে বিপক্ষে অনেক কিছুই ভাবা যায়, যুক্তি দাঁড় করানো যায়। আপনারা বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, সেটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। যার তার ধর্ম এবং বিশ্বাসের ব্যাপার! কথায় বলে, “বিশ্বাসে মিলায় বস্তু; তর্কে বহুদূর...”।

শুক্রবার, ২৮ জুন, ২০১৩

ভুল


ভুল

ফিডেল ডি সাংমা
(জাহিদ কবির হিমনকে)

তোমার হাসির মোহে মোনালিসা ভেবে
রেখেছিলাম তোমার- একগাছি চুল,
তুমি মলাধারে ডুবে আমায় বুঝিয়ে দিলে
করেছি ক্ষমার অযোগ্য; হিমালয় ভুল।

সোমবার, ১৭ জুন, ২০১৩

এ জার্নি বাই মাইক্রো টু ভার্সি


এ জার্নি বাই মাইক্রো টু ভার্সিটি...
(এক মিনিটের গল্প)
ফিডেল ডি সাংমা

গতকাল মাঝরাতে বেবীকে তার গালে একটা কিস্‌ দিয়ে গুড নাইট বলে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ওয়াল ক্লকে এলার্ম শুনেই ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। রাতে ঘুম হলে শরীরটা খুব টায়ার্ড লাগে। তবুও নিজের অনিচ্ছার সাথে ফাইট করে উঠতে হল। বেডথেকে নেমে দেখি আমার ওয়াইফ তাড়াহুরা করে ব্রেকফাস্ট রেডি করছে। আজ হলি ডে। ভার্সিটিতে ভ্যালেন্টাইন ডে'র ফাংশান হবে। চার্মিং ব্যান্ড দল আসবে। দ্রুত বাথরুমে গিয়ে ব্রাশটা হাতে নিয়েই দেখি টুট পেষ্ট নেই। আজ বেবীর টুট পাওডার দিয়েই কাজ সারতে হবে। বেশ কয়েকদিন যাবত বাচ্চার মার জন্য ফেইস ওয়াশ আনতে হবে; তাও মনে থাকে না। স্যুট- টাই পড়ে হালকা ফ্লেভারের পারফিউমটা সারাটা শরীর স্প্রে করে নিলাম। আন্টিকে বাসার মেইন গেইট লক করতে বলে প্রায় দৌঁড়ে ফুটপাট ধরে হাঁটছি। মেইন রোড আজ খুব বিজি। রোড সাইডে হকাররা প্যাপার, ম্যাগাজিন ভাগাভাগি করছে। আজ ভাবছি- টেঙ্ক্যিাব বা স্কুটারে যাবো না। ইদানিং সিটিতে ভাড়ায় মাইক্রো পাওয়া যায়। তবে রেন্ট এ কার লেখা থাকে না। যাই হোক- টাইম কিল করার সময় নাই। প্রফেসর জন আর আমাকে সব দায়িত্ব না দিলেও পারত। আমরা যেন অল রাউন্ডার। সবাই আমাকে পেয়ে বসেছে, বউ-বাচ্চার জন্য সময় দিতে পারি না। আমার পুরো ভার্সিটির লাইফটাই খাটিয়ে মারল।

কালচারাল অনুষ্ঠানের টোটাল ম্যানেজমেন্ট কেমন হবে তা নিয়ে ভাবছি আর হাঁটছি। প্যান্টের পকেটথেকে বেরসিক মোবাইলটা বার বার রিং হচ্ছে। অমনি একটা রিক্সা বেল না বাজিয়ে বেক করতে গিয়ে আমার হ্যান্ড বেগের চেইনটা ছিঁড়ে দিল। ভেরী বেড লাক। রাগে ফায়ার হয়ে গেলাম। আজ প্রচন্ড রাগলেও প্রকাশ করা যাবে না। ফ্রেন্ডরা বলে, রাগলে না-কি আমাকে খুবই বিধ্বস্ত চেহারা লাগে, আনস্মার্ট লাগে...। - ওসব ফাল্টু কথা ভেবে লাভ নেই। শার্ট পকেটথেকে সান গ্লাসটা বের করে চোখে দিলাম। ফার্ম গেইটের ওভার ব্রিজ পেরিয়ে আবার মেজাজটা বিগড়ে গেল। আনন্দ সিনেমা হলের সামনেও প্রচন্ড জ্যাম। দাঁড়িয়ে কোন খালি গাড়ি আসলে হাত নেড়ে ডাকবে কিংবা চট্‌ করে গাড়িতে উঠে পড়বে- তারও উপায় নেই...। - সরকারের মহা মন্ত্রীরা জনগনের ইনকাম টেক্সের টাকা খেয়ে খেয়ে গদি আগলে বসে আছেন। দেশের কেন্দ্রস্থল রাজধানী ঢাকা সিটিকেই যারা শান্তিতে রাখতে পারেন না, তারাই দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেন। আর আর মেয়র সাহেব, উনি কি করেন.....,ক্ষোভটা যেন বেড়েই উঠছিল। হঠাৎ পেছনথেকে বোমা সাইজের ড্রাইভার বলে উঠল-
'স্যার যাইবেন..?'
হ্যাঁ- যাবো...
মনে মনে বলি- শালা ইডিয়েট! বেটা বলে কি, চৈত্রমাসের খরা রৌদ্রে রোডের উপর দাঁড়িয়ে আছি কি তামসা করার জন্যে... যাবো মানে- আমার বাপ-দাদা চৌদ্দগুষ্ঠি যাবে...।
'কই যাইবেন স্যার'
'ও হ্যাঁ, ভারসিটি যাবো, যাবেতো না-কি? '
'জী স্যার- যাবো'
'ভাড়া কত নেবে...?'
'তিনশো টাকা দিয়েন স্যার'
'আহ্‌ এতো কেনো, জিনিস-পাতির দামের সাথে তোমাদের ভাড়াও বেড়ে যায় নাকি...'
'ঈদতো আইসা গ্যালো স্যার, বোনাস দিবেন না....'
'আহ্‌ যে ভাবে বলছ- আমার মানি ব্যাগযে খালি করে দেবে। যাও, সব মিলিয়ে তোমাকে ২০০.০০ টাকা দেবো, চলবে....?'
'জ্বি স্যার....'
পাবলিক লাইব্রেরীতে ঢুকতে হবে। গতকাল সেক্রেটারীকে বলেছিলাম ওয়েটিং রুমের টেবিলের উপর পেপার ট্রে-তে লটারীর টিকিট আর লাঞ্চের টোকেনগুলো রাখতে। ওই বেটা সেভাবে রেখেছে কি-না কে জানে! এখন মেইনরোড একটু ফাঁকা হয়েছে। দুদিকথেকে ছোট, বড়, মাঝারী, লাল, নীল, বেগুনী, সবুজ, হলুদ ইত্যাদি বিভিন্ন সাইজ আর কালারের গাড়ী ছুটাছুটি করছে।

'খুব কেয়ারফুলি চালাবে, বুঝলে। রোডে এক্সিডেন্ট করে বসো না....'
'এক মিনিট স্যার, প্লিজ আপনি সিটে বসুন, আমি এসি-টা ছেড়ে দিচ্ছি। কন্‌ফেকশনারীথেকে একটা মিনারেল ওয়াটার নিয়ে আসি, লেইট হবে না।'
'ওকে গুড- যাও- তাড়াতাড়ি কর....'

সময় যত গড়িয়ে যাচ্ছে আমার টেনশান তার ডাবল হচ্ছে। সাইড লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে লেজি চালকের জন্য ওয়েট করছি। সামনের রেড লাইট অফ হয়েছে। ট্রাফিক পুলিশ হুইসেল দিয়ে হাত নাড়ছে। অবশেষে আমাদের মাইক্রো রিস্টার্ট দিয়ে রেইল ক্রসিং ওভারটেক করল.....।

সুপ্রিয় পাঠকবৃন্দ, আসুন আমরা এই গল্পে কতটা ইংলিশ ওয়ার্ড আছে, তা ভাবার আগে একবার নিজের সংস্কৃতি নিয়ে একবার ভাবি। আমরা কি নিজেদের মধ্যে নিজস্ব ভাষায় কথা বলি? নিজস্ব সংস্কৃতি ভুলে যাচ্ছি কি?   আসুন আমরা আমাদের নিজস্ব জাতি-সংস্কৃতিকে ভালবাসা ও সম্মান দেই। ধন্যবাদ।

বুধবার, ১২ জুন, ২০১৩

((জামাই)) -গল্প


((জামাই)) -গল্প- জুয়েল রানাকে

by Fidel D Sangma (Notes) on Wednesday, June 12, 2013 at 10:13pm
(১)
জাহিদুল ইসলাম আরমান ওরফে মাষ্টর সাব। মেধাবী অথচ চালচলনে সহজ সরল। প্রায় ১৫/১৬ কিমি দূরে গ্রামের “আলোকিত মধুপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়”-এর সহকারী শিক্ষক। একবছর আগে চার বন্ধু- সুলতান মাহমুদ, সামিউল আলম, হারুনুর রশিদ, বচন পোদ্দার সকলেই একসাথে শিক্ষকতায় চাকুরী পেয়ে যান। প্রতিদিন যাতায়াতে অসুবিধা হওয়ায় পিতা হাজী মোঃ আতিকুল ইসলাম ছেলেকে রসুলপুর গ্রামে মোঃ আব্দুল লতিফ মন্ডলের বাড়িতে জায়গীর থাকতে বললেন। জাহিদুল কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই রসুলপুর গ্রামের নিরক্ষর জনগণদের প্রিয় মাষ্টর সাব হয়ে উঠলেন। এভাবেই মোঃ আব্দুল লতিফ মন্ডলের ৪/৫ বছরের নাতি ফজলুর সাথে সখ্যতা জাহিদুলের। ফজলুর দাদু ফজলুকে আদর করে “বর-বাই” বলে ডাকেন। মাষ্টর সাবের ঘরেও শুকনো খাবারগুলো ফজলুর জন্যই রাখা থাকে। স্কুলের পরও ফজলু প্রায় সারাদিন স্যারের পেছন পেছন ঘুরে। তাই জাহিদুল ইসলাম ইঁচড়েপাকা ফজলুকে নিয়ে গিয়ে তার দাদুর সামনে দাঁড়ায়-
-       আসসালামুয়ালাইকুম চাচা,
-       আলাইকুম ছালাম, কিরম আছুইন- মাষ্টর সাব?
-       জী চাচা- ভালোই আছি, আপনি আমাকে নাম ধরেই ডাকবেন। আর তুমি করে বলবেন-
-       আইচ্ছা, তা কইর- কিছু কইবা?
-       জী চাচা। আপনার এ নাতি খুব চালু। তাই অভ্যাসের জন্য তাকে স্কুলে ভর্তি দিতে চাই- কি বলেন”।
-       এইডা কি কও! বাইত তুমারে হারাদিন জ্বালায়, আবার ইশকুলেও...

গ্রামটিতে এখনও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে নি। তবে এলাকার লোকজন যেমন-  ধর্মপ্রাণ; বয়স্করা নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত নামাজ পরেন, খানকা শরিফে সাপ্তাহিক জিগির হয়। রোজা রাখেন, জাকাত-ফিতরা দান করেন। তেমনই জুয়েল চৌধুরী, বাবুল সরকার, লুই মারাক, সঞ্জিব নাথ, হিমেল সরকার, সুজিত দাস; উনারাও যার যার সংসার ধর্ম পালন করে যাচ্ছেন, পরস্পরের সুবিধা অসুবিধার খবর নিচ্ছেন এবং একে অপরের পারিবারিক উৎসবেও উপস্থিত হচ্ছেন। এমনই শান্তিময় সহাবস্থানের এই গ্রামের নাম রসুলপুর।

মোঃ আব্দুল লতিফ মন্ডলের ২ ছেলে ৪ মেয়ের মধ্যে শেষ মেয়ে ফিরোজা আক্তার ওরফে জবাকুসুম; ১০ম শ্রেনীতে পড়ে। প্রায় দুই কিলো দুরের মাধ্যমিক স্কুলে গিয়ে তাকে পড়াশুনা করতে হয়। প্রথমদিকে বড় ভাই কবিরুদ্দিন সাইকেলে করে দিয়ে আসতো, কিন্তু এখন রাস্তা আর আশপাশের লোকজন পরিচিত হওয়ায় আর দিয়ে আসতে হয় না। জাহিদুল ইসলাম আরমান ওরফে মাষ্টার সাহেবও একই পথে যায় বলে জবাকুসুমের সাহসটাও একটু বেড়েছে। দেখতে সুন্দরী হওয়ায় গ্রামের সব যুবকের চোখে জবাকুসুমের দিকে। তবে গ্রামের নানী দাদী, কুটনী বুড়ীরা তাকে খুব কমই সহ্য করতে পারেন। এর রেশ ধরে মাষ্টর সাব আর জবাকুসুমকে নিয়ে সমালোচনা হলে- হতেও পারে।

(২)
তিনদিনের এজতেমায় গেছেন আঃ লতিফ মন্ডল। পাহাড়ি রাস্তা; ঝোঁপঝাঁড়ের কাঁটা আর নুঁড়ি বিছানো থাকে বলে তাঁর বড় ছেলেটাই সাইকেলে করে দিয়ে এলেন। ফজলুও খুব করে বায়না ধরেছিলো এজতেমায় যাওয়ার। “বড়-ভাই, আপনি তো কালই ফিরবেন, ছেলেটাকেও সঙ্গে করে নিয়ে আসতে পারবেন” বলেই জাহিদুল তার প্রিয় শিষ্য ফজলুকে রিজার্ভ করা ভ্যানে তুলে নিয়ে গিয়েছিলো।

হাজারের কাছাকাছি লোকের সমাগম। সে তুলনায় সামিয়ানা ছোটই মনে হচ্ছে। এতগুলো মুসল্লি এক সাথে কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ পরা যাবে কিনা বলা যাচ্ছে না। এদিকে অজু সারতে হবে একটা ছোট্ট দিঘিতে। গতবছর বৃষ্টি কম হয়েছিলো বলে দিঘিতে এবার পানিও কম। তাই যাতে পানি ময়লা-ঘোলা না হয়, এজন্যে খুব সাবধানে অজু করার নোটিশ টানানোর পরও বার বার মাইকে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। ধর্মপ্রাণ লোকজন অবশ্য তা মেনেও চলছেন।

২য় দিন ভোরেই সবাই জেগে উঠল। কবিরুদ্দিন তার ছেলে ফজলুকে নামাজের পরেই নিয়ে ফিরে যাবেন। সবাই যে যার মত অজু সেরে নামাজে সামিল হলেন। কিন্তু নামাজ শেষে মাষ্টর সাহেবের দামী জুতো-জোড়া আর খুঁজে পেলেন না। এখন উপায়! অগত্যা পুরোনো জুতো দেখে পরে আরও দুইদিন কাটিয়ে দিল। আশে পাশে খাবার এবং দুয়েকটি টুপি আতরের দোকান ছাড়া অন্য কোন দোকান নেই। জুতো কিনে নিরাপদে ফিরবেন। আগামীকাল জুম্মার নামাজের পর সবাই যার যার মত করে বাড়ী ফিরে যাবে। মেরাজ, মিঠু, মুহিদ, সবুজ সবাই মিলে খোঁজাখুঁজির পরও তার দামী জুতো-জোড়ার কোন হদিস মিলল না।

এজতেমার শেষদিনে বিশ্বের সকল মানুষের মঙ্গলের জন্য, বিশ্ব-শান্তির জন্য জুম্মার নামাজে আখেরি মুনাজাত করা হল। সবাই যার যার মত ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু মাষ্টার সাহেব  ফিরবেন কি করে, খালি পায়ে?  রাস্তা জুড়ে যে ভাবে কাঁটা আর নুঁড়ি ছড়ানো ছিটানো থাকে, মনে হবে- কেউ ইচ্ছে করে যেন বিছিয়ে রেখেছে। আসার পথে এমরান আর আরমানের পায়ে বিঁধে রক্ত ঝরল, সোহেলের পায়ের বুড়ো আঙ্গুলটা ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হল; আর মুন্নাফ চাচা আরও একধাপ এগিয়ে; হুঁচোট খেয়ে নুড়িতে পরে গেল আর পেছনের চামড়া ছিঁড়ে গিয়ে ধপধপে সাদা জোব্বাটা রক্তে ভিজে চপচপ করছিল- ওহ! এসব ভাবতেই জাহিদুলের গা শিওরে উঠছে। কিন্তু কোথায় পাবে তার জুতো-জোড়া? জাহিদুল ভাবতে লাগলো- তার জুতো যিনি নিয়ে গেলেন, তার জুতো কই? ওটা হলেও চলতো। নিশ্চয়ই তার পায়ের মাপ একই হবে। সেটা জানা যখন আর মোটেই সম্ভব না, অন্য কারোর জুতো পরেই ফিরতে হবে। তাই বলে জুতো চুরি (নাউজুবিল্লাহ)!

(৩)
জায়গির বাড়িতে মাষ্টার সাহেবের থাকার রুমের বারান্দায় সবসময়ের জন্য চেয়ার টেবিল পাতা থাকে। ৩দিন পর ফিরে এসে দেখে তার রুম, বারান্দা, চেয়ার টেবিল সব ঝকঝক করছে। আর  টেবিলের ওপর একটা গোলাপী রঙের জবাফুল পরে আছে। ‘পরে আছে নয়; বলতে হবে দিয়ে গেছে’ অবাক হয়ে ভাবতে থাকে জাহিদুল। কে করলো এত সুন্দর কাজ? জবাকুসুম কি? এমন একজনকে জীবনসঙ্গী হিসাবে পেলে মন্দ হতো না।

বারান্দায় বসে রাস্তার অনেকদূর দেখা যায়। লোকেরা দল বেঁধে কাঁধে ব্যাগ-বোচকা নিয়ে ফিরছে। সেই দলে মাঝ বয়সী এক লোক খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে আসছেন। আহা! উনাকে দেখে মায়াও লাগছে। এই ধর্মপ্রাণ মানুষের ব্যাগটা নিয়ে উনার বাড়ীতে দিয়ে আসতে পারলে- একটা সওয়াবের কাজ হয়ে যেত। কিন্তু এতদূর নিজের ব্যাগ কাঁধে বয়ে এসে নিজেও অত্যধিক ক্লান্ত; ওটা যখন কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না, তাই অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে তাকিয়ে রইলো জাহিদুল। এবার জবাকুসুমকে নিয়েই ভাবতে শুরু করছে জাহিদুল।

“স্যার স্যার, আমি আন্নের জুতাডা আমার ব্যাগঅ ভইরা নইয়া আইসি”। .ফজলুর চিৎকারে জাহিদুলের ভাবনায় ছেদ পরে। মাষ্টার সাহেব তার জুতো-জোড়া দেখে থ।
-       এটা কোত্থেকে পেলে তুমি?
-       ক্যা-? হেদিন আন্নে এবা দামী জুতা বারান্দায় হালাই থুইয়া নামাজঅ গেলাইনগা, আর-ত ফিরুনের নামগুন্দ আছাল না। এন্নিগাই ত- আমি এইন্না আমার ব্যাগঅ ভইরা হালাইছিলাম।
-       তারপর-
-       তারহরে আর কি, আমি আন্নের নিগা খারই অইছি, হেসুম বাজান আমারে জুর কইরা সাইকলঅ তুইল্যা নইয়া আইলো।
-       হায়হায়রে বাজান, তুই করছস কি-
-       হ- স্যার, বাজানের জুন্তে আন্নেরে জুতা দিয়া আহাইলাম না
-       ইয়াল্লাহ! তবে আমি কার জুতা ...।
কথাগুলো শুনে জাহিদুলের দু’কান গরম হয়ে উঠল, আর মনটাও ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। জুতো-জোড়া হাতে নিয়ে ফজলুকে কোলে তুলে নেয়। ফজলুর জন্য রাস্তার দোকানথেকে লেবেনচুস আনতে ভুলে নি জাহিদুল। ওগুলো হাতে ধরিয়ে দিতেই ফজলুর ছানাভরা চোখ চলে যায় তার অতিপ্রিয় মাষ্টর সাব-এর পায়ের দিকে। জুতোগুলো ফজলুর চেনা চেনা লাগছে, কিন্তু আবার সে ব্যস্ত হয়ে পরে লেবেনচুসে।

ফজলু তার স্বভাবমত প্রায় ১৫ মিনিট ধরে বকবক করছে। সুযোগ বুঝে জবাকুসুমের খবর নেয় জাহিদুল। হঠাৎ ফজলুর ডাকে চমকে যায় সে। ছেলেটি চিৎকার দিয়ে বলছে, ‘দাদু গো, অ দাদু- আন্নে এবাই খুড়াইয়া আতটাছুইন ক্যা? অ দাদু- আন্নের ঠ্যাং খাইল্যা ক্যা?’ দাদুকে খুব কাহিল দেখাচ্ছে; গলা দিয়ে কথা বেরুচ্ছে না; তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে একটুখানি কাশলেন। ততোধিক জোরে ফজলু আবার বলে- ‘দাদু, অ দাদু, এই য্যা আন্নের জুতা...’
ফজলুর ছোট্ট আঙ্গুলের ইশারা অনুসরণ করে দাদু তার জুতো-জোড়া দেখতে পেলেন জাহিদুল মাষ্টরের পায়ে। যাকে কিছুক্ষণ আগেও জবাকুসুমের সাথে বিয়ে দিয়ে ছোট জামাই করার কথা ভাবছিলেন... 

(গল্প এবং চরিত্র কাল্পনিক. কাউকে ব্যক্তিগত সুখ বা আঘাত করার জন্য নয়।)