মঙ্গলবার, ২২ মে, ২০১২

নীল আকাশে নীলু- StorY


[[[নীল আকাশে নীলু]]]
*ফিডেল ডি সাংমা

 "বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে " হাই স্কুলে রত্না'দি, বাংলার টিচার এমনভাবে পড়াতেন যেন উক্তিটা তারই লেখা বা তার জন্যই লেখা। নির্দিষ্ট কোন বিষয় কটটুকু ভালোবাসলে পেশা ও আচরণে তা প্রকাশিত হয়, তা উনাকে দেখলেই বুঝা যায়। সুন্দর ও সহজ করে বুঝানোর ক্ষমতা, গুণ ঈশ্বর নিজ হাতে উনাকে দিয়েছেন।কোন প্রকার ভালোবাসার পরিমাপ করার যোগ্যতা আমার নাই। বিধাতা প্রয়োজনীয় বোধ শক্তি আমাকে কেন যে দেননি, তা আমার অজানা। আমি ঐ ঈশ্বরের কাছে অন্তহীন প্রার্থনা করেছি, উত্তর পাইনি। মানুষের কাছেও সাহায্য চেয়েছি তাও পাইনি।মধুপুরের কোন একটা গ্রামে আমাদের বাড়ী। গারোঞ্চলের মধ্যে আমাদের গ্রাম শিক্ষায় আগে এগিয়েছিলো, গ্রামে এই শিক্ষাই আমাদের অর্থনীতিতে খুব দ্রুত এগিয়ে দিয়েছিলো; আর এনে দিলো বৃহত্তর বাঙ্গালী সমাজের সাথে যোগাযোগের সুন্দর সুযোগ। অগারোদের সাথে যোগাযোগ আর অর্থনৈতিক ভাবে এগিয়ে দেওয়ার সুবাদেই নিলুফা বেগমের মতো অনেক অযাচিত জাতি-ধর্ম ত্যাগীর জন্ম। নিলুফা বেগম গারো ছিলো, আর এখনোও গারোই আছে, তবে অনুমোদনহীনভাবে। গারোত্বের স্বীকৃতি হারিয়েছে সে, তবে "এর জন্য দায়ী কে ?" এমন কঠিন প্রশ্নগুলো ভেতরে ভেতরে গুমড়ে মরে। তার মতো আর কোন কোন নিলুফা বেগমের জন্ম গারো মায়ের গর্ভে জন্ম না হোক- এই চাওয়াতেই আমার গল্পের শুরু----
-
সেরেনজিং, রেরে গেয়ে কিংবা ওয়ান্‌গালা অনুষ্ঠানে প্রেম করে বিয়ে করার যুগে নীলুর সাংমার বাবা মায়ের জন্ম নয়। তবু হজ সরল এ গারো দম্পতির মাঝে গারোত্বকে, মূল্যবোধকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। অনেক দূরে গিয়ে পড়তে হতো বলে কৈশরে স্কুলে ভর্তি হতে হয়েছে তাদের আর প্রাইমারী পার হওয়ার সাথে সাথে যৌবনে দু'জনের অভিভাবকদের পছন্দেই নীলুর সাংমার বাবা মায়ের বিয়ে। মায়ের যেমন সুন্দর গঠন তেমনি সুন্দর রং। বাবার পছন্দ নীল রং। যখন যেখানে নীল রঙের কোন কিছু পান, মায়ের জন্য আনবেনই। অথচ বাবা বলতেন, "ঠিক তা না, তোমার মা-ই নীল আকাশটাকে খুবই ভালোবাসতো, আকাশের গায়ে যখন নীলে ভরে যেতো, বাস্তব জ্ঞানশুণ্য হয়ে ঐ নীলে তাকিয়ে থাকতো- তাইতো তোর নাম দিয়েছি নীলু, আমাদের ভালোবাসার মেয়ে- নীলু।এতদিনে গ্রামে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে; শুধু নীলুর বাবার সরলতা আর প্রায়ই অসুস্থ থাকার কারণে তাদের পরিবারে উন্নয়ন আসেনি। বড় মেয়ে নীলু, আর তার সাথে তিন বোন দুই ভাই। নীলুর মা ছোট ভাইকে জন্মের সময় আকাশে চলে গেলেন। অসহায় বাবা সংসারের অভাব সত্ত্বেও হোস্টেলে রেখে পড়াতে চেষ্টা করলেন। হাইস্কুল নিরাপদেই দুই বোন পেরোলা। আট কিলোমিটার দূরে কলেজে পড়তে যেতেই ঘটলো বিপত্তিটা বাঁধে। প্রতিদিন বাসে লোকজনের ধাক্কাধাক্কি সয়ে কলেজে যেতে হয়। কিন্তু কিছু বিশেষ ব্যক্তির ধাক্কাটা অন্যরকম। তাদের এমন পরিবেশের সাথে পাল্লা দিয়ে কলেজে আসা যাওয়া বড় কঠিন হয়ে পড়ল। হ্যাঁ ঠিক তাই; ব্যবসার নামে কাশেম নামের এক লোক এলো বাড়ীতে। কাকা ডাকতেই সহজ সরল নীলুর বাবা অজ্ঞান। শুধু তাই না, লোকটি গ্রীষ্ম-বর্ষায় প্রতিদিন অনেক দূর থেকে যাতায়াত করেন অথবা কাজের চাপ দেখে করুণায় তাদের বাড়ীতে থেকে যেতে অনুমতি দিলেন। তারপরও ঘটনা থেমে নেই, এটা ওটা সংসারের অভাব পূরণ করে দিয়ে বাবার কাছের লোক বনে গেলেন। এমনি একদিন বাজার থেকে বড় মাছ কিনে দিয়ে বাবার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, "মামা, অনেক দিন পর তোমার মেয়ে দুটো এলো মামিকে বল যেন ভাল করে রান্না করে খাওয়ায়।" একদিন কাশেমের অগোচরে নীলুর ছোট মামা বাবাকে শাসালেন, "গুমি, তোমার ঘরে যুবতী দুই মেয়ে ছোটটাও প্রায় সাবালিকা। কোন আক্কেলে ঐ লোকটাকে বাড়ীতে থাকতে দিচ্ছো। অই শালার নিজের ঘরে তিন ছেলে মেয়ে। স্ত্রী পুত্র রেখে ছয় মাস যাবত বাড়ীতে যায় না দেখছি, তুমি এসব দেখে বুঝো না? নাকি দেখেও না দেখার ভান করছো...?" জ্ঞানের কথা শুনে নীলুর বাবা উল্টো রেগে গিয়ে বললেন,
  • আমাকে জ্ঞান দিচ্ছো...? তোমরা শিক্ষিত হওয়ার সাথে সাথে তোমাদের মনও ছোট হয়ে যাচ্ছে। মানুষকে মানুষ ভাবতে শেখো। তোমাদের দিদি নেই, এত দিন কত কষ্টে সংসার চালাচ্ছি। কই এর মধ্যে কোন খোঁজ নিয়েছো...? এই লোকের দয়ায় এখন একটু ভালো থাকতে পারছি। মেয়েদের হোস্টেলের খরচের জন্য টাকার জন্য ঋণের জন্য ছুটাছুটি করেছি, তখন কেউ দেখেছো ? আমার একমাত্র ফসলী ভালো জমিটাই হারাতে বসেছি। তোমাদের টাকা-পয়সা কিছু আছে বলে তোমার সন্তানরা পড়বে, শিক্ষিত হবে। আমার সন্তানরা পিছিয়ে থাক- এটাই কি চাইছো ?"
  • তা চাইবো কেন ? তুমি ভালো করে জেনে দেখো। লোকটা খুনী, ফেরারী আসামী। ভালো, দয়ালু লোক সেজে তোমার এখানে আশ্রয় নিয়েছে।"
  • হোক ফেরারী আসামী, কিন্তু সে তো অতীত। আর সে নিজেথেকেই স্বীকার করেছে, ওটা তার শত্রুপক্ষের চক্রান্ত..." "তাই বলে এই কুত্তার বাচ্চাকে তুমি জামাই আদর দিয়ে রাখবে ? ছিঃ গুমি ছিঃ..."
  • মুখ সামলে কথা বল, ও জমিতে বর্ষার পরেই খামার ঘর তুলবে এবং তার বউ বাচ্চা নিয়ে এসে ওখানেই থাকবে। তোমার আর কিছু বলার না থাকলে, যেতে পারো; তোমার জ্ঞানের কথা শোনার সময় আমার নেই।

কাশেম বেপারী ছিলোও তাই। কিন্তু স্ত্রী পুত্রদের আনা হয়নি বরং নীলুর ছোট ভাইসহ আরো কিছু গারো যুবকদের যুগিয়েছে। যারা তাকে সঙ্গঁ দেয়, রাতভর টিভি দেখে, তাস খেলে আড্ডা জমায়। গারো ছেলেরা জামাই যাবে তাই বাবার অন্ন ধ্বংস করা ছাড়া কাজ কি ! শুকর মাংস, মদ, গরু, খাসী সবই চলছে সেখানে।
-
এমনি করে সাত বছর গড়িয়ে গেল। নীলুর ছোট বোন বুনো এবার এস,এস,সি পরীক্ষা লিখবে। ফর্ম ফিলাপের টাকার দরকার। সুযোগ বুঝে যেচে কাশেম বেপারী এসে নীলুর বাবার হাতে হাজার খানেক টাকা গুঁজে দিয়ে বললেন, "মামা, তোমার মাইয়ারাতো আমার বইনের মতই, ছোট বইনের ফরম ফিলাপের টেকা যোগার করতে পারতাছ না হুনলাম। বুনোর বুদ্ধি ভালা, টাকার অভাবে পরীক্ষা দিবার না পাইরলে, আমারও খারাপ লাগব। মামা, এই তাড়াতারী টেকাডা রাইখা দেও। কাউরে বলবা না, টেকাডা আমি দিতাছি। যাও বইনের কামডা করাইয়া আহো।"বাবা টাকাটা নিলেন এবং সেদিনথেকেই কাশেমের উপর বিশ্বাসটা গভীর হয়ে গেল।

কাশেমের এ ছলছাতুরীর কায়দাটা ভালো কাজে লেগেছে। এতদিন নীলুরা কেউই কাশেমের নোংরামী ইংগিতের কথা বাবার কাছে বলেনি বলে- তাদের পরিবারের প্রতি কাশেমের দ্বিগুণ উৎসাহের কারণ সহজ সরল বাবার কাছে অজানাই রয়ে গেল।

-
এস,এস,সি পরীক্ষায় বুনোকে আর গ্রামেরই আরেক ছেলেকে আনা-নেওয়া করছে কাশেম বেপারী। বোনটাও কাশেমের পিছে মরে সাইকেলে অনায়াসে যাতাযাত করছে। বড় ভই বলেও প্রায় অজ্ঞান। আর নিজের ভাই দু'টো অকর্মণ্য- কোন কাজের না। লেখা পড়া ছেড়ে সারাদিন এখানে ওখানে ঘোড়াঘুড়ি আর আড্ডা। পাঠ্য পুস্তকে পড়া "অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী" কথার যথাপোযুক্ত প্রমান এই ভাইদের দেখে বাস্তবে দেখা যায়। আর এদিকে ছোট বোনের অবাধ চলাফেরা দেখেও কিছু বলা পারলো না নীলু। এমনিতে গ্রামে তাদের বিষয় নিয়ে কানাঘুষা, টিপ্পনি চলছে। এ মুহুর্তে হৈ-চে করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। ছোট বোনও এই পরীক্ষার সময় মনে কষ্ট পেতে পারে, এমন কি পড়া বাদও দিয়ে দিতে পারে। বুকের মাঝে অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে সবই সয়ে যাচ্ছিলো নীলু।
-
বুনোর পরীক্ষার মাঝেই বড় অঘটন ঘটলো একদিন। অফিসের কাজ শেষ করে হন্তদন্ড হয়ে নীলু ছুটে গেলো পরীক্ষাথেকে ছোট বোনকে আনতে। সেদিন এমনিতেই দেশে হরতাল। আজ আবার বাড়তি সমস্যা করল ঝর-বৃষ্টি। এদিকে মেঘের কারণে সন্ধ্যাটা তাড়াতাড়ী নেমে এলো। বিকেলের পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগে থেকে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে নীলুর পা ব্যথা হয়ে গেল। পরের দিন হরতালের কারণে বাস গাড়ী কমে গেছে, রিস্কা ভ্যান পাওয়া যাচ্ছিল না। তিন বছর ধরে অফিস সহকর্মী সুজনের সাথে নীলুর প্রেমের সম্পর্ক। সুজনকে বললে ঠিকই চলে আসতো। লাঞ্চের পর আর ওর সাথে দেখা হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে কাশেম বেপারীর আগমন তাদের দুই বোনের মনে কিছুটা সস্তি এনে দিল। মেঘ না চাইতেই জল। কাশেম নীলুর সামনে তার মটর সাইকেল দাঁড় করিয়ে বলল, "তম'গর বাড়ীর দিকেই যাইতাছি। হুনলাম তরা অনেক্ষণ এইহানে দাঁড়াইয়া আছ, আমার লগে যাইবা নাকি... ? নীলু ইস্ততস্ত করছে, ছোট বোন বললো, "হে দাদা যাবো।" - কিন্তু একটা গাড়ীতে দুই জন যাবো কি করে ...
  • বাস রিস্‌কাও তো পাইবা না। হুইনা আইলাম, ওই দিকে রাস্তার উপর টায়ার পুইড়া দিছে। আর বাড়ীর কাছে কাচা রাস্তায় কাঁদার লাইগা রিসকাঅলারাও যাইতে চাইব না।-
  • অন্ধকার হয়ে গেছে, আমাদের কেউ দেখবে না দিদি। চল ছোট বোন বলে।
  • হে - কষ্ট অইলেও উইঠা পড় বইন। আমার আবার সামনে দশ মিনিটের লাইগা সালামের লগে দেখা করন লাগব।
  • আজ দেখা না করলে হয় না আপনার? আবারওতো বৃষ্টি আসতে পারে। ভেতরে ভেতরে ভয় করছিল নীলুর।

তবে প্রকৃতি-ঝরের জন্য নয়, মানুষের জন্য। দিনকাল খুব খারাপ। কাউকেই বিশ্বাস করা কঠিন।সেদিন কাশেম বেপারী সালামের সাথে দেখা করল না ঠিকই কিন্তু আবার ঝর বৃষ্টি হয়ে গেল। কোন রকমে সামনের দোচালার খুপড়ী চায়ের দোকানে ওদের আশ্রয় নিতে হল। এ ভাঙ্গা চা-স্টলে আগেই পরিচিত মাছ বিক্রেতা আজমল মিয়া আশ্রয় নিয়েছে। তাকে দেখে নীলুর ভয়টা একটু কাটলেও বৃষ্টি আর কাটে না, অবিরাম ঝরছে তো ঝরছেই। নীলু জানে, বাড়ীতে বাবা নিশ্চয় মহাচিন্তায় পড়েছে। কিন্তু এও জানে যে, অসুস্থ বাবার পক্ষে বৃষ্টিতে বেড় হওয়াও সম্ভব না। ভাবনায় ছেদ পড়ে কাশেমের প্রশ্নে--

  • মাছ বেচা শেষ অইছে চাচা ?
  • না বাজারই তো ঠিক মতো বইলোনা, বাজারে হাটুরে সমান পানি, হাতাইলেই মনে অয়লো মাছ পাওয়া যাইতো, আমার কাছথিকা মাছ কিনবো ক্যা ?
  • কি মাছ নিয়া আইছিলাইন চাচা ?
  • কয়ডা ইলিশ মাছ, কেউ দাম কইলোনা। তাই বেচা অয় নায়। বাজারও করতে পারিনাইগো বাপ, কাইল পোলাপাইন না খাইয়া থাকবো।
  • দেহি চাচা...

কাশেমের মনে দরদটা উথলে উঠলো যেন। নীলু আর বোন নীরব দর্শক। কড়কড়ে দুইশত টাকায় বড় দেখে তেলতেলে একটা মাছ কিনল কাশেম। এবার মাছ ওয়ালার চোখে-মুখে কৃতজ্ঞতার ছাপ। দৃশ্যটি দেখে নীলুরও ভালো লাগে। কাশেমকে এতদিন যতখানি ভয় পেয়ে আসছিলো, আজকের ঘটনায় ভয়টা একটু কেটে যেতে লাগল। ঘটনার প্রায় এক ঘন্টা পর বৃষ্টি কিছুটা থেমে গেল। দাদা, দিদি চল যাই, বৃষ্টি একটু থেমেছে, কাল সকালে আমার পরীক্ষা আছে- পড়তে হবে..." ছোট বোনের কথার পর বিনা বাক্য ব্যায়ে সবাই বেড় হল। কাচা রাস্তায় পানি জমে গেছে। অনেক বার গাড়ী থেকে নেমে পায়ে হাটতে হল। নীলুদের বাড়ী যাওয়ার পথেই কাশেমের খামার। খামারে গাড়ীটা রেখেই যেতে হবে। কাশেম কাদাঁয় গাড়ী টানতে টানতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আজ বৃষ্টির কারণে নীলুর ছোট ভাই কিংবা পাড়ার ছেলেরা কেউই এ খামার বাড়ীতে আড্ডা মারতে আসে নি অথবা হতে পারে কাশেমের দেরী হওয়ায় তারা সবাই যে যার মত চলে গেছে। কাশেম বলে, গাড়ীডা রাইখা, একটু জিরাই, পানি খাইয়া যাই- গলা হুক্কাইয়া কাঠ অইয়া গেছে।
  •  দাদা আমিও পানি খাবো, ছোট বোন বলে ঠিকাছে।
  • দুপুরে কি খাইছ বইন ?
  • খাই নাই, টেনশনে আমি খাইতে পারি না
  • কিসের টেনশন ?
  • পরীক্ষার- ও...! কিন্তু আমার ঘরে তো খাবার কিছুই নাই। বুয়াও এত রাইত পর্যন্ত থাকার কথা না।
  • তাইলে তুমি কি খাইয়া থাকবা?
  • ক্যা, এই যে কাঁচা মাছ আর দুই গেলাস পানি.... বলেই হা হা করে হাসার চেষ্টা করে। নীলু এতক্ষণ চুপ করেই ছিলো। আবার কাশেম বলে-
  • এত বড় মাছ নিয়া আইছি। তেমরা যদি রাইন্ধা দিয়া যাইতা তাইলে আমার না খাইয়া থাকতে হইত না।কাশেমকে সত্যি সত্যিই অসহায় লাগছে। নীলুর হ্যাঁ বা না বলার আগেই ছোট বোন বলে,
  • রেঁধে ফেলো দিদি। বেচারী আমাদের জন্য এত কষ্ট করল। 
কাশেম যেন বুঝে গেছে। আগেই রান্নাঘর খুলে মাছটা রেখে আসলো। গাড়ীটা ধুঁয়ে রাখবে বলে রান্নাঘর লাগোয়া কলপাড়ে রেখে দিলো। কাশেম বলে, বুনো তুই এক কাজ কর, আমার রুমে বাতি জালাইয়া দেই- তুমি পড়। কাইল তা পরীক্ষা। তর রান্না করন লাগব না। তর দিদি রান্না করুক, আর আমি গাড়ী ধুঁই, কি চলব না ?
.
কথা শেষ হতেই সবাই রোবটের মত যে যার কাজে লেগে গেল। টিনের চালের বৃষ্টির আওয়াজকে বুনো তোয়াক্কা করে না পড়তে শুরু করেছে। নীলুও ভয়-দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে কোমরে শাড়ী গুঁজে আপন মনে কাজ শুরু করে দিয়েছে। রান্না ঘরের পাশেই বোধ সাপে ব্যাঙ ধরেছে ক্যাক ক্যাক করে প্রাণ বাঁচানোর আওয়াজ তুলছে। অবশ্য এমন আওয়াজে নীলুরা ভয় পায় না, শিশুবেলাথেকেই এসম আওয়াজ শুনে অভ্যস্ত। কিন্তু হঠাৎ পেছনেই ব্যাঙ লাফানোর মত আওয়াজে নীলু চমকে ওঠে। পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে কাশেম বেপারী হাতে জগ নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। তাকিয়ে অবাক হয়, নীলু শান্তভাবে প্রশ্ন করে, "কিছু লাগবে ?" কাশেম সামনে এগিয়ে এসে "হ্যা লাগবে, লাগানোর জন্যই এসেছি" বলেই নীলুকে ঝাপটে ধরে। নীলু কোনরকমে জোড়করে ছাড়িয়ে নিয়ে পায়ের কাছে রাখা বঁটিতে হাত দেয়। "কুপিয়ে শেষ করে দেব..." বলে হাত উঁচাতেই কাশেম নীলুর হাত ধরে ফেলে, বঁটি কেড়ে নিয়ে নীলুর মুখ চেঁপে ধরে বলে, "একদম চুপ করবি। চিল্লাচিল্লি করবা তো, বুনো হুইনা ফালাইব, পাড়ার মাইনষেও হুনলে কইব- ভালা কুন মাইয়া এত রাইতে এই নির্জন খামারে আইসত না। আর হুন, তুই রাজি না অইলে, তর বইন দুইডারেও শেষ কইরা ফালামু, তাগরেও একটা একটা কইরা ইজ্জত লমু। নিজের চখেই ত দেখলা, বুনো এখন আমার হাতের মুঠিতে। বিল্লুর বিয়া দিতাস সামনের পৌষ মাসে... সব শ্যাষ কনরা ফালামু। মুখ শক্ত হাতে মুখ চেপে ধরেছে কুত্তাটা। যেন বাঘের থাবায় শিশু হরিণ পড়েছে। কোন ভাবেই ছাড়ানো যাচ্ছে না। তরিৎ গতিতে আগের তিন বোনের আলাপের কথা নীলুর মনে পড়ে। বুনোর আশাভরা, উচ্ছ্বাসিত মুখ চোখে ভেসে উঠে। নীলু ৩ বোনকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলো, আমি তোমাদের সবার আশা পূরণ করবো, আমার জীবন দিয়ে হলেও... ভাবতে ভাবতে গোঁ গোঁ শব্দ করতে করতে নীলু মাটিতে পড়ে যায়। জ্ঞান হারায়।
.
***এরপর দশ বছর চলল। কথা রেখেছে নীলু। বুনো পড়াশুনা শেষ করে চাকরীতে ঢুকেই সহকর্মীকে বিয়ে করল। মেজো বোন বিলুর অনেক দূরে বিয়ে হয়েছে। দুটি ফুটফুটে সন্তানও হয়েছে ওদের। বাকী সব ছোট ভাই-বোনদেরও বিয়ে করিয়েছে নীলু। ওরাই এখন বাবাকে দেখে। আর তার এক সময়ের কাঙ্খিত পুরুষটি চোখের সামনে কাশেমের নিলর্জ্জতা দেখে সড়ে দাড়াল। আত্মীয়-স্বজনের চাপাচাপিতেও ছেলেটা কিছুতেই সড়তে চাইছিল না। যে লোক খুন করে জেল খেটে পালিয়েছে, যে লোক তার প্রেমকে খুন করতে পারে, তাকেও খুন করতে দ্বিধা করবে না বলে সড়ানো গেছে। দশ বছর আগেই নীলু মারা গেছে। নীলুকে দাফন দিয়ে নীলুফা বেগম সেজে এ খামারে ওঠেছে। জন্ম হয়েছে নীলুফা বেগমের। যেখানে তার জীবনের আশা আকাঙ্খা, সুখ স্বপ্ন, সতিত্ব আর ভালোবাসার বিসর্জন দিয়েছিল। নিজের কোন ছেলেপুলে নেই নীলুফার, সন্তান নেবেও না কোনদিন। সতিনের ছোট ছেলেটা বাপ ভক্ত। তাই নীলুফাই এই ছেলের দেখাশুনা করে। মনে মনে বলে, সাপের বাচ্চা সাপই হয়- দুধ কলা যতই দেওয়া হোক।
-
এতদিন নীলু মাকে খুজঁতো, আপন মনে ভাবতো আর বলতো, মা কি ওই দূরের আকাশে থাকে ? আজ নীলুফা বেগম সেই আকাশে নীলুকে খোঁজে। আপন মনে নীল আকাশে তাকিয়ে প্রশ্ন করে - নীলুর মৃত্যুর জন্য দায়ী কে ? নীলুফা বেগমের ভবিষ্যত কি ? যন্ত্রণার বোঝা নেওয়া নীলুর মতো একটা মেয়ের পক্ষে কতটুকুইবা সম্ভব ছিলো। এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করার দায়িত্ব কি নীলুর একার ? পরিবারের, গোষ্ঠির, সমাজের না কি রাষ্ট্রেরও... ?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন